বাংলাদেশের ভুট্টা আমদানির বাজারে দীর্ঘ আট বছর পর আবারও অবস্থান তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে (এমওয়াই) বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানির ৬ শতাংশ এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশ মোট ১৭ লাখ ৪০ হাজার টনের বেশি ভুট্টা আমদানি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার টন ভুট্টা এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
বাংলাদেশের পশুখাদ্য শিল্পের চাহিদা পূরণে ভুট্টা আমদানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের পোলট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতের সম্প্রসারণের কারণে প্রতিবছর ভুট্টার চাহিদা বাড়ছে।
তবে বাংলাদেশের ভুট্টা আমদানির বাজারে এখনো সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী ব্রাজিল। ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশের মোট ভুট্টা আমদানির ৬৮ শতাংশ এসেছে ব্রাজিল থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত, যার অংশ ২৪ শতাংশ।
এর আগে ২০২৪-২৫ বিপণন বছরে বাংলাদেশের ভুট্টা আমদানিতে ব্রাজিলের আধিপত্য আরও বেশি ছিল। সে সময় প্রায় ৯৩ শতাংশ ভুট্টা এসেছিল ব্রাজিল থেকে। আর্জেন্টিনার অংশ ছিল ৪ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ২ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পুনরায় প্রবেশ শুরু হয় চলতি বছরের শুরুতে। বাংলাদেশের কয়েকটি পশুখাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান প্রথমে প্রায় ৬০ হাজার টন ভুট্টা আমদানির উদ্যোগ নেয়। সেই চালান জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা আমদানি বাড়ার পেছনে দুই দেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সম্পর্কও ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশের ভুট্টা বাজারে বড় অংশ দখল করা সহজ হবে না। কারণ ভুট্টার ক্ষেত্রে দাম, পরিবহন সুবিধা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে ব্রাজিল ও ভারত দীর্ঘদিন ধরে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
ইউএসডিএ বলছে, ঐতিহাসিকভাবে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় ভুট্টা সরবরাহকারী ছিল। কম দাম, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা এবং কম দূরত্বের কারণে ভারতীয় ভুট্টার চাহিদা ছিল বেশি।
তবে ২০২৪ সালের পর ভারত থেকে রপ্তানিযোগ্য ভুট্টার পরিমাণ কমে যায়। দেশটি বায়োফুয়েল উৎপাদনে বেশি পরিমাণ ভুট্টা ব্যবহার শুরু করায় রপ্তানির জন্য উদ্বৃত্ত কমে আসে। এর সুযোগে ব্রাজিল বাংলাদেশের বাজারে বড় সরবরাহকারী হয়ে ওঠে।
চলতি ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশের বেসরকারি খাত প্রায় ১৮ লাখ টন ভুট্টা আমদানি করতে পারে বলে ধারণা করছে ইউএসডিএ। এটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের পোলট্রি, মৎস্য চাষ এবং গবাদিপশু খাদ্য শিল্পের সম্প্রসারণের কারণে ভুট্টার আমদানি চাহিদা শক্তিশালী থাকবে।
তবে প্রতিবছর আমদানির পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। কারণ এটি নির্ভর করে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে গড়ে প্রায় ১৫ লাখ টন ভুট্টা আমদানি হয়েছে। বর্তমানে ধান ও চালের পর জমির পরিমাণ এবং উৎপাদনের দিক থেকে ভুট্টা দেশের অন্যতম বড় শস্য ফসল হয়ে উঠেছে।
ইউএসডিএ জানিয়েছে, উচ্চ ফলন, ভালো বাজারমূল্য এবং লাভজনকতার কারণে কৃষকেরা ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। উন্নত হাইব্রিড বীজ এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বাড়ছে।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও শীত—দুই মৌসুমেই ভুট্টা চাষ হয়। চলতি বিপণন বছরে দেশে ভুট্টা উৎপাদন প্রায় ৬০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে ইউএসডিএ, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি।
তবে দেশের উৎপাদন বাড়লেও পশুখাদ্য শিল্পের চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে বছরে ৭১ লাখ টনের বেশি ভুট্টার প্রয়োজন হয়।
দেশের উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যবহার করে পশুখাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে পোলট্রি খাদ্যে ভুট্টা প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশে ভুট্টার মোট ব্যবহার ৭২ লাখ ৫০ হাজার টনে পৌঁছাতে পারে বলে ইউএসডিএ পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশের ভুট্টা বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরি করলেও বাজারে আধিপত্য ধরে রেখেছে ব্রাজিল ও ভারত। ভবিষ্যতে দাম, সরবরাহের নিশ্চয়তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে কোন দেশ বাংলাদেশের ভুট্টা আমদানিতে বড় অংশীদার হয়ে উঠবে।

