বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা। রপ্তানি বাড়ানো, স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাধা কমানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান তারা।
বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানি ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শুল্ক কমানো গেলে দুই দেশের পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক দামে বাজারে পৌঁছাতে পারবে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়বে।
রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় আয়োজিত পঞ্চম দিনের ‘মেড ইন পাকিস্তান’ প্রদর্শনীতে এসব বিষয় উঠে এসেছে। পাঁচ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীতে পাকিস্তানের ১০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে।
পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সিবিশন ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে তৈরি পোশাক, প্রসাধনী, ক্রীড়া সামগ্রী, গয়না, খাদ্যপণ্য, চামড়াজাত পণ্য ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এম খুরশিদ বারলাস বলেন, এই প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলো দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা এবং পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বুঝতে পারবেন কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে এবং বাংলাদেশের ভোক্তারা কোন পণ্য গ্রহণ করতে আগ্রহী।
খুরশিদ বারলাস জানান, আগের প্রদর্শনীগুলোতেও পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো সাড়া পেয়েছে। এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ পান।
তিনি আরও জানান, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামেও একই ধরনের প্রদর্শনী আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে খুরশিদ বলেন, শুল্ক কমানো গেলে দুই দেশের পণ্য আরও সহজে বাজারে প্রবেশ করতে পারবে।
তার মতে, বর্তমানে দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকার কাঠামো থাকলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে এর পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না।
তিনি বাংলাদেশ সরকার ও ব্যবসায়ীদের পাকিস্তানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ প্রদর্শনী আয়োজনের আমন্ত্রণ জানান। এ ধরনের আয়োজনের জন্য পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব এক্সিবিশন ইন্ডাস্ট্রি ব্যবসায়িক বৈঠক, প্রচারণা এবং অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বর্তমান প্রদর্শনীতে পাকিস্তানের ২৫০ জনের বেশি প্রতিনিধি অংশ নিচ্ছেন। তারা বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, আমদানিকারক এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করছেন।
পাকিস্তানি ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশেরও পাকিস্তানে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, পাট, তাজা খাদ্যপণ্য এবং তৈরি পোশাক খাতে সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বাজারে নতুন পরিবেশক খুঁজছে। একই সঙ্গে কেউ কেউ দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কার্যক্রম, যৌথ উদ্যোগ এবং উৎপাদন সহযোগিতার সম্ভাবনাও যাচাই করছে।
পাকিস্তানের ভোক্তা পণ্য ও প্রাকৃতিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কারশি ইন্ডাস্ট্রিজের বিপণন বিভাগের প্রধান উমের শেখ বলেন, বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে।
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটির ৫০০টির বেশি পণ্য রয়েছে, যার বেশিরভাগই প্রাকৃতিক উপাদানভিত্তিক। তাদের প্রধান পণ্যগুলো বিভিন্ন মান যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাজারজাত করা হয়।
কারশির বাংলাদেশে একজন পরিবেশক থাকলেও তারা বিশেষ করে ঢাকায় আরও পরিবেশক খুঁজছে বলে জানান তিনি।
প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের দাম প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
আরেকটি পাকিস্তানি প্রতিষ্ঠান মেডিকাম গ্রুপও বাংলাদেশে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ খুঁজছে। প্রতিষ্ঠানটি ভোক্তা পণ্য, ওষুধ, হারবাল পণ্য, চুলের যত্ন, ব্যক্তিগত পরিচর্যা সামগ্রী এবং শিশুপণ্য তৈরি করে।
প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি বিপণন বিভাগের প্রধান আতিফ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থায়ী পরিবেশক নেই। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্ভাব্য অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, প্রদর্শনীর মাধ্যমে তারা পরিবেশক, আমদানিকারক এবং বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছেন। কেউ কেউ যৌথ উদ্যোগ ও বাংলাদেশে উৎপাদন স্থাপনের বিষয়েও আগ্রহ দেখিয়েছে।
তবে পাকিস্তানি পণ্যের বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে আমদানি শুল্ক কাঠামোর কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ১২০ শতাংশ থেকে ১৯০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, যা ভোক্তাদের জন্য দাম বাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু সাময়িক বিক্রি নয়, বরং বাংলাদেশের বাজারে টেকসইভাবে অবস্থান তৈরি করা।
পাকিস্তানি বাসমতি চাল উৎপাদনকারীরাও বাংলাদেশের বাজারে নিজেদের অবস্থান বাড়াতে আগ্রহী। কাওসার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এম সুলেমান জাফর বলেন, বাংলাদেশে বাসমতি চালের চাহিদা পর্যবেক্ষণ করে তারা স্থানীয় পরিবেশক খুঁজছেন।
তিনি জানান, সুগন্ধ ও স্বাদ বাসমতি চালের প্রধান আকর্ষণ। তবে আমদানি শুল্কের কারণে বাংলাদেশে এই চালের দাম তুলনামূলক বেশি।
ভালো মানের পাকিস্তানি বাসমতি চালের দাম বাংলাদেশে প্রতি কেজি প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে তিনি জানান।
পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোও বাংলাদেশের বাজারে সুযোগ খুঁজছে। পাকিস্তানি পোশাক ব্র্যান্ড নুরেহ প্রথমবারের মতো এই প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় ও প্রবৃদ্ধি বিভাগের প্রধান দারাব আলী বলেন, শুরুতে সাড়া কিছুটা ধীর থাকলেও পরে গ্রাহকদের আগ্রহ বেড়েছে।
বাংলাদেশি ক্রেতারা পাকিস্তানি নকশা ও কাপড়ের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে জানান তিনি। বিশেষ করে লন, খাঁটি সুতি, শিফন ও সিল্ক কাপড়ের চাহিদা রয়েছে।
নুরেহর পণ্যের দাম কাপড়, নকশা ও উৎপাদন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
দারাব আলী জানান, পাইকার, পরিবেশক ও বিপণন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও প্রদর্শনীতে এসেছেন। চাহিদা ভালো থাকলে বাংলাদেশে সারা বছর কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও শুল্ক কাঠামো, বাজার প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো সমাধান করা প্রয়োজন।
‘মেড ইন পাকিস্তান’ প্রদর্শনীর আয়োজকদের মতে, এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরি এবং বাংলাদেশের বাজারে পাকিস্তানি পণ্যের সম্ভাবনা যাচাই করা। প্রদর্শনীটি ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের জন্য খোলা ছিল।

