চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর কুনমিংয়ে বিনামূল্যে একটি স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশটির ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের পক্ষ থেকে এই সুবিধা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা চীনের বিশাল বাজারে সারা বছর পণ্য প্রদর্শন করে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ পাবেন।
জানা গেছে, কুনমিংয়ের একটি বিপণিবিতানে বাংলাদেশি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের একটি প্রদর্শনকেন্দ্র এবং তার পাশে সমপরিমাণ জায়গার একটি গুদাম বিনামূল্যে দেওয়ার কথা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোকে জানিয়েছে চীন সরকার। এই বিপণিবিতানে আরও কয়েকটি দেশকেও একইভাবে পণ্য প্রদর্শনের জন্য স্থায়ী জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে সেসব দেশের প্রতিষ্ঠান চীনের বিভিন্ন শহরে পণ্য সরবরাহ করছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর একজন ভাইস চেয়ারম্যান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রদর্শনকেন্দ্রটি পরিচালনার জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়া চলছে, যারা ইতিমধ্যে একটি খসড়া চুক্তি পাঠিয়েছে। তার প্রত্যাশা, চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রদর্শনকেন্দ্র চালু করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছরের মে মাসে ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের একটি উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য উন্নয়ন কেন্দ্রের একজন উপপরিচালকের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর করে এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে বিনামূল্যে এই কেন্দ্র ও গুদাম সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, যাতে বাংলাদেশ ইতিবাচক সাড়া দেয়। এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে কুনমিংয়ে আয়োজিত একটি ফল উৎসবে এই সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তি সই হয়, যেখানে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের একটি ফল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দল অংশ নিয়েছিল।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আগেই জানিয়েছিল, বিনা ভাড়ায় প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম ছাড়াও ইউনান প্রদেশের নির্ধারিত একটি অনলাইন কমোডিটি প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে প্রবেশের সুযোগও মিলবে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের, যার মাধ্যমে তারা একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করতে পারবেন। এছাড়া তাজা ও দ্রুত পচনশীল কৃষিপণ্যের দ্রুত শুল্ক খালাসের সুবিধাও তারা পাবেন।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত তাকে এই বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, যা দেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি বড় সুযোগ। তিনি জানান, গত বছর তারা চীন সরকারের কাছে সাতটি স্থানে স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম বরাদ্দের অনুরোধ করেছিলেন, যার একটি এখন বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এটি সফল হলে ভবিষ্যতে আরও এ ধরনের সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি। কোন ধরনের পণ্য এখানে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চীনে যেসব পণ্যের নিজস্ব উৎপাদন কমে যাচ্ছে সেসব পণ্যই বাংলাদেশকে বেশি করে তুলে ধরতে হবে, এবং প্রতিযোগিতায় টিকতে সবচেয়ে ভালো মানের পণ্যই সেখানে নিয়ে যেতে হবে।
উল্লেখ্য, চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। সর্বশেষ অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় তেইশ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ চীন থেকে আমদানি করেছে বাইশ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য, বিপরীতে রপ্তানি করেছে মাত্র আশি কোটি ডলারের কিছু বেশি পণ্য। ২০২০ সালে চীন বাংলাদেশি পণ্যের জন্য প্রায় সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা চালু করলেও, এবং ২০২৪ সালে প্রায় সব পণ্যে সেই সুবিধা সম্প্রসারিত করলেও, বাস্তবে দুই দেশের বাণিজ্য এখনো মূলত আমদানিনির্ভরই থেকে গেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর কর্মকর্তারা জানান, গত জুনে সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কুনমিংয়ের এই প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। যে বিপণিবিতানে বাংলাদেশকে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, সেখানে চীনের পাইকারি ব্যবসায়ীদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান এই সুযোগকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এর মাধ্যমে চীনের বাজারে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে। তবে কোন ধরনের পণ্য এই কেন্দ্রে প্রদর্শিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তিনি জানান। তার ভাষ্যমতে, চীনে যেসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে সেগুলোই মূলত প্রদর্শন করা হবে, তবে চীনের নিজস্ব বিভিন্ন মানদণ্ড ও শর্তের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি যেভাবে বেড়েছে, তাতে এই ধরনের বিনামূল্যের প্রদর্শনী সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে, তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে সঠিক পণ্য নির্বাচন এবং মানসম্মত সরবরাহের ওপর।

