বাংলাদেশে মাশরুম চাষ ও বাণিজ্যিক উৎপাদন দ্রুত সম্ভাবনাময় কৃষি খাতে পরিণত হচ্ছে। বাড়ছে ভোক্তার চাহিদা, পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সচেতনতা এবং বাণিজ্যিক চাষে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ। এর ফলে দেশের মাশরুম বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের মাশরুম বাজারের আকার প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার। তুলনামূলক কম বিনিয়োগ, অল্প জায়গা এবং দ্রুত উৎপাদনের কারণে গ্রামীণ পর্যায়ে আয়ের নতুন উৎস হিসেবে মাশরুম চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে।
মাশরুম উৎপাদন বাড়ার ফলে বাংলাদেশে এর আমদানির ওপর নির্ভরতাও কমেছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে মাশরুম আমদানি হয়েছিল ৬৯ দশমিক ৯৩ টন। এরপর ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে ১৭ দশমিক ৪২ টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র ৪ দশমিক ৯৭ টনে নেমে আসে।
মাশরুম চাষ প্রকল্পের পরিচালক ড. আখতার জাহান কাকন জানান, বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৪২ হাজার টন মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে। এর বাজারমূল্য প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার।
তিনি বলেন, ভোক্তারা বিভিন্ন ধরনের মাশরুম সম্পর্কে জানতে শুরু করায় এবং নতুন উদ্যোক্তারা বাণিজ্যিক চাষে যুক্ত হওয়ায় বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে অয়েস্টার, মিল্কি, ব্ল্যাক মাশরুম এবং গ্যানোডারমা বা রেইশি মাশরুমের বাণিজ্যিক চাষ হচ্ছে। গবেষণা পর্যায়ে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ধরনের মাশরুম নিয়ে কাজ চলছে।
একসময় বাংলাদেশে অয়েস্টার মাশরুমই সবচেয়ে বেশি চাষ হতো। তবে বর্তমানে উদ্যোক্তারা গ্যানোডারমা, মিল্কি মাশরুম ও ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের মতো নতুন জাতের দিকেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
পার্বত্য অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত ব্ল্যাক মাশরুম এখন বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে। আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠী এটি প্রাকৃতিকভাবে সংগ্রহ করলেও এখন নিজেরাই উৎপাদন শুরু করেছেন।
তবে উৎপাদন বাড়লেও দেশে মাশরুমের ব্যবহার এখনো তুলনামূলক কম। তাই ভোক্তা সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাজার তৈরি করা এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. কাকন বলেন, উদ্যোক্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাশরুম চাষ ও ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ প্রতিদিন মাত্র ২৫ গ্রাম করে মাশরুম খেলেও বছরে প্রায় ১৫ লাখ ৫০ হাজার টন মাশরুমের চাহিদা তৈরি হতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, মাশরুম কম ক্যালরি ও কম চর্বিযুক্ত হলেও এতে প্রোটিন, আঁশ, ভিটামিন বি এবং বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে।
পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, মাশরুমে থাকা এরগোথায়োনিন, গ্লুটাথায়োন ও ফেনোলিক যৌগ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করতে পারে।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ার কারণে বর্তমানে অনেক মানুষ নিয়মিত খাদ্যতালিকায় মাশরুম যুক্ত করার বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছেন।
মাশরুম চাষের সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে যশোর, মাগুরা, রংপুর, বগুড়া, সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকার সুপারশপ, আধুনিক বাজার এবং সাধারণ কাঁচাবাজারেও তাজা মাশরুম পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় মাশরুম দিয়ে তৈরি খাবার যেমন ভাজা খাবার, স্যুপ ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
এই খাত নারীদের জন্যও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। অনেক নারী উদ্যোক্তা মাশরুম দিয়ে কেক, পিঠা, চিপস, স্যুপ, জ্যাম, জেলি ও চাটনি তৈরি করছেন।
কেরানীগঞ্জের উদ্যোক্তা লাবনী আক্তার জানান, মাশরুম চাষে কম সময় ও জায়গা লাগে, তাই এটি নারীদের জন্য বাড়তি আয়ের ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি মূলত মাশরুমের বীজ বা স্পন উৎপাদন ও বিক্রি করেন। প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার ইউনিট স্পন বিক্রি করেন তিনি। প্রতি ইউনিট স্পনের উৎপাদন খরচ প্রায় ১৫ টাকা হলেও বিক্রি করেন ৩০ টাকায়।
মাশরুম চাষ ও স্পন বিক্রি থেকে তিনি বছরে প্রায় দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করেন বলে জানান।
দেশের মাশরুম খাতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। কয়েকটি জাতের মাশরুমের নমুনা বিদেশি বাজারে পাঠানো হয়েছে এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
সিলেট থেকে গ্যানোডারমার নমুনা হংকংয়ে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস, অয়েস্টার ও রেইশি মাশরুমের নমুনাও পাঠানো হয়েছে।
তবে এখনো বাণিজ্যিক রপ্তানি শুরু হয়নি। নিয়মিত মানসম্পন্ন উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মাশরুম চাষ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৬৬০ জন উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং কার্যক্রম ৪৮টি জেলায় সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশিক্ষণ, বাজার উন্নয়ন, প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরি এবং রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে মাশরুম চাষ ছোট উদ্যোগ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষিভিত্তিক শিল্পে পরিণত হতে পারে।

