ভৌগোলিক অবস্থান ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে লজিস্টিকস ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠার বড় সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুয়িকি কাতাওকা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন।
কাতাওকা জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনাকে জাপান অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। এ লক্ষ্যে দেশের অবকাঠামো ও শিল্প খাতের উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী করিডরকে কেন্দ্র করে ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) গড়ে তোলার বিষয়ে বাংলাদেশ ও জাপান ইতোমধ্যে একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক শিল্প ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে।
জাপানের সহযোগিতায় চলমান মাতারবাড়ী উন্নয়ন প্রকল্প ও যমুনা রেলসেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে বলে জানান কাতাওকা। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে এগুলো আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
তবে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও শিল্পের কেন্দ্র বানাতে শুধু অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন তিনি। সড়ক, রেলপথ ও সমুদ্রবন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে পণ্য ও মানুষের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে নীতিগত উদ্যোগ নিতে হবে। পরিবহন নেটওয়ার্কের মধ্যে সমন্বয়, আরও দক্ষ লজিস্টিকস ব্যবস্থা এবং সীমান্তপারের চলাচল সহজ করা গেলে আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরও নিবিড় হবে।
জাপানি বিনিয়োগ টানতে ব্যবসাবান্ধব, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন কাতাওকা। তিনি বলেন, একাধিক সরকারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়ই প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়। একটি সমস্যা সমাধানে একাধিক সংস্থার দ্বারস্থ হতে হলে বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি বাড়ে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি একক যোগাযোগকেন্দ্র গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। এটি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধান নিশ্চিত করবে।
কাতাওকার মতে, ওয়ান-স্টপ সেবাকে শুধু আবেদন গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। এর আওতায় ‘কেস ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। সেখানে নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা দপ্তর একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন বা সমস্যা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নেবে।
সরকারি সেবা আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ডিজিটাল করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। যতটা সম্ভব পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা গেলে স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে এবং ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমবে বলে তাঁর মত।
কাতাওকা বলেন, দক্ষ অবকাঠামো, পূর্বানুমানযোগ্য নীতিমালা ও সমন্বিত সরকারি সেবা মিলিয়ে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিনিয়োগ ও সরবরাহব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা সহজ হবে।
এসব উদ্যোগ এগিয়ে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ার মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক সুফল মিলবে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ঢাকা-চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী করিডরের সফল উন্নয়ন এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও শিল্প নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারে। এতে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

