১৯৮৫ সালে অটোমোবাইল ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু করা ইফাদ গ্রুপ এখন গভীর আর্থিক সংকটে। টানা তিন অর্থবছর ধরে লোকসান করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঋণের বোঝা বাড়ছে, বাড়ছে সুদ ব্যয়। ব্যবসার আয় দিয়ে এখন সুদের পুরো অর্থও শোধ করা যাচ্ছে না। আপন দেশের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গ্রুপটির ব্যবসা এখন ভোগ্যপণ্য, মাল্টি প্রডাক্টস, হোম কেয়ার, অটো সার্ভিস, প্রযুক্তি ও নির্মাণ খাতের যন্ত্রপাতিতে ছড়িয়ে আছে। তবে মূল ও সবচেয়ে বড় ব্যবসা ভারতীয় বাস আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি। টাটা ও অশোক লেল্যান্ডের মতো ভারতীয় কোম্পানির যেসব বাস সরকারি পরিবহন পুল ও বিভিন্ন বাহিনীতে চলছে, তার বেশির ভাগের সরবরাহকারী ইফাদ। বাংলাদেশ সরকারই গ্রুপটির বড় ক্রেতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি দরপত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকা এবং সরকারের ঘনিষ্ঠতার সুবিধা নিয়ে গ্রুপটি বড় হয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সরকারের পতনের পর তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদনে দৃশ্যমান হচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও তিন বছর ধরে ভুগছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠার ৩০ বছর পর, ২০১৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ইফাদ অটোস। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ মুনাফা হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, নিট ৪১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এরপর থেকেই লোকসান চলছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান ছিল ১৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ১৬ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান ৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা আগের বছরের অর্ধেকেরও কম।
লোকসানের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি রিজার্ভ ভেঙে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিতে শুরু করেছে। সাধারণত কোনো কোম্পানি চরম দুঃসময়ে রিজার্ভে হাত দেয়। বর্তমানে রিজার্ভে থাকা ৫৮৬ কোটি ৬১ লাখ টাকার অবস্থা কী, তা নিয়ে কোম্পানি কিছু বলছে না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্যে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেখানো হয়েছে ৫২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কিন্তু বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি ঋণ ৬৬৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি অর্থ এক ডজনের মতো ব্যাংক থেকে লিজ ও বন্ড আকারে নেওয়া।
বন্ড বাবদ দায় ৩০০ কোটি টাকা। ব্যাংকভিত্তিক দায়ের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ১৫ কোটি ৬৯ লাখ, ওয়ান ব্যাংকের ২ কোটি ৩৫ লাখ, প্রাইম ব্যাংকের ৪ কোটি ৯৭ লাখ এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ২৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। লিজ বাবদ দায় ২ হাজার ১৩ কোটি টাকা। ঋণ ও বন্ডের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বেড়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানির মোট দায় দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। বিপরীতে নিজস্ব পুঁজি ৯৫৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি এক টাকা মূলধনের বিপরীতে দায় ৩ দশমিক ৩২ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে, অর্থাৎ গত মার্চ পর্যন্ত, দায় আরও বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ১৮৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। নিজস্ব মূলধন ৯৬০ কোটি ১১ লাখ টাকা। এ সময়ে সুদ পরিশোধ হয়েছে ৪৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। প্রতিবেদনের হিসাবে, এখন পুরো গ্রুপ বিক্রি করলেও ব্যাংকের ঋণের তিন ভাগের একভাগও শোধ হবে না।
লোকসানের মধ্যেও মূল প্রতিষ্ঠান থেকে ১১৯ কোটি টাকা সরিয়ে নতুন ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। চলতি অর্থবছরে গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত সর্বশেষ অনিরীক্ষিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টস নামে নতুন প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। এর চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ টিপু। গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকিন আহমেদও এতে আছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি।
বাস ব্যবসায় বিক্রি বাড়লেও মুনাফা বাড়ছে না। ব্যবসা সচল রাখতে ঋণ বাড়ানো হচ্ছে। ফলে কয়েক বছরে সুদের বোঝা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯৪৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বিক্রি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৭৪৮ কোটি ১৫ লাখ টাকায়। পরের বছর বিক্রি ১৯ দশমিক ২৫ শতাংশ বেড়ে হয় ৮৯২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। তবু নিট লোকসান হয়েছে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা। কারণ, বিক্রির চেয়ে দ্রুত বেড়েছে বিক্রয়সংশ্লিষ্ট খরচ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য বিক্রির খরচ ছিল ৬৩৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ৭৮০ কোটি ১১ লাখ টাকা। এক বছরে খরচ বেড়েছে ১৪১ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ। বিক্রি বেড়েছে ১৯ দশমিক ২৫ শতাংশ। ফলে বাড়তি বিক্রির সুফল মুনাফায় আসেনি।
ইফাদ অটোসের সুদ ব্যয় পাঁচ বছরে ৩২ কোটি ৩২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৫০ কোটি ৪৩ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা সাময়িকভাবে ২৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় নেমেছিল। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩০ কোটি ৭৩ লাখ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪২ কোটি ৩৬ লাখ টাকা হয়। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত সুদ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। মোট ব্যয়ের মধ্যে সুদের অংশ ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
একই সময়ে পরিচালন মুনাফা কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা ছিল ১০৭ কোটি টাকার বেশি, পরে ৫০ কোটির নিচে নেমেছে। এখন সুদ ব্যয় আর পরিচালন মুনাফা প্রায় সমান।
সুদ কভারেজ অনুপাত এ সংকটের স্পষ্ট চিত্র দেয়। পাঁচ বছর আগে এই অনুপাত ছিল ৩ দশমিক ১৬, অর্থাৎ সুদের খরচের তিন গুণের বেশি আয় ছিল। পরে তা কমে ২ দশমিক ৬৩, তারপর ১ দশমিক ০৯ এবং সর্বশেষ ০ দশমিক ৯৬-এ নেমেছে। অর্থাৎ মূল ব্যবসার আয় দিয়ে সুদের পুরোটা শোধ করা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন ব্যাংকে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি প্রান্তিকে সব ব্যাংকের পুরো কিস্তিও শোধ করতে পারছে না তারা। এভাবে চললে চলতি অর্থবছর শেষে সুদ শোধ করার মতো অর্থই থাকবে না বলে প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে।
প্রশ্নের লিখিত উত্তরে ইফাদ অটোস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ বলেন, কাঁচামাল ও আমদানিসংশ্লিষ্ট ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারজনিত বাড়তি খরচ এবং লজিস্টিকস, জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় মুনাফার মার্জিনে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি সামলাতে ব্যয় সাশ্রয়, ক্রয়প্রক্রিয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিচালন দক্ষতা উন্নয়ন এবং যথাযথ মূল্য নির্ধারণে জোর দেওয়া হচ্ছে।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সরবরাহকারীদের সঙ্গে দর-কষাকষি, মজুত ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস দক্ষতা বাড়ানো এবং উৎপাদনজনিত অপচয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সুদ কভারেজ অনুপাত কমে যাওয়াকে উদ্বেগের বিষয় বলে স্বীকার করেন তানভীর আহমেদ। তাঁর ভাষ্য, গ্রুপটি আর্থিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে প্রথম ধাপে এই অনুপাত ১ গুণের ওপরে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি জানান, ইফাদ অটোস অশোক লেল্যান্ডের বিভিন্ন মডেলের সম্পূর্ণ তৈরি যানবাহন, যন্ত্রাংশ ও সিকেডি আমদানি করে। এরপর দেশে বিক্রির জন্য স্থানীয়ভাবে সংযোজন, বডি তৈরি ও কেবিন নির্মাণ করা হয়। তাঁর মতে, প্রতিযোগিতা বজায় রেখে বডি ও কেবিন নির্মাণে বাজার আরও বড় করার সুযোগ আছে।
প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব তথ্য প্রধানত আর্থিক প্রতিবেদন ও শেয়ারবাজারের নথির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ডিএসই ও বার্ষিক প্রতিবেদনে ঋণের অঙ্কে বড় পার্থক্য থাকায় হিসাবের এই অসঙ্গতি নিয়ে কোম্পানির ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। এখন দেখার বিষয়, ঋণদাতা ব্যাংকগুলো কী অবস্থান নেয় এবং কোম্পানি সুদ কভারেজ ঠিক করার প্রতিশ্রুতি কতটা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: আপন দেশ

