বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা পাটজাত পণ্যের ওপর নতুন করে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছে ভারত। পণ্য ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী শুল্কের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নতুন শুল্কের আওতায় রয়েছে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পাটের সুতা, দড়ি, কাপড় ও বস্তা। চলতি বছরের জুনে ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) এসব পণ্যের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা সম্পন্ন করে। ওই পর্যালোচনার চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতেই এবার শুল্ক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বাংলাদেশি পণ্য নিয়ে ভারতের অভিযোগ
ডিজিটিআরের পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশ থেকে পাটজাত পণ্যের আমদানি সামগ্রিকভাবে কমেছে। এরপরও বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের বিরুদ্ধে ভারতে পাটপণ্য ডাম্পিং অব্যাহত রাখার অভিযোগ করেছে সংস্থাটি।
ভারতের কর্তৃপক্ষের দাবি, এ ধরনের আমদানির কারণে দেশটির স্থানীয় পাটশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ছে।
পর্যালোচনার সময়কালে ভারতে পাটজাত পণ্যের সামগ্রিক চাহিদা ২০ শতাংশ কমে যায়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি কমেছে ১৩ শতাংশ। ডিজিটিআরের হিসাবে, চাহিদা কমার তুলনায় আমদানি কমার হার কম হওয়ায় বিদেশি উৎপাদকরা ভারতীয় বাজারের উল্লেখযোগ্য অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিদেশি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ভারতীয় উৎপাদকদের নিজেদের পণ্যের দাম কমাতে হয়েছে।
ডাম্পিংয়ের হার কত
বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটজাত পণ্য আমদানির কারণে স্থানীয় উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন—ভারতের পাটশিল্পের বিভিন্ন সংগঠনের এমন অভিযোগের পর গত বছরের জুনে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা শুরু করে ডিজিটিআর।
পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাটপণ্য আমদানির পাশাপাশি ভারতের স্থানীয় শিল্পের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। এতে নমুনাভুক্ত বাংলাদেশি পাটপণ্যের ক্ষেত্রে ডাম্পিংয়ের হার ৫ থেকে ৫৫ শতাংশের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপালের ক্ষেত্রে ডাম্পিংয়ের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বলে জানিয়েছে ডিজিটিআর।
তবে নতুন শুল্ক কাঠামোয় নির্দিষ্ট কিছু উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে পণ্য ও উৎপাদকভেদে ভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি কমেছে
ডিজিটিআরের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমেছে।
ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১ লাখ ১৭ হাজার টন পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হয়। এর আগের অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৩ হাজার টন।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৬ হাজার টন।
ডাম্পিংয়ের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশের
ভারতের ডাম্পিংয়ের অভিযোগ অবশ্য প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশের পাটশিল্প। শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের দাবি, বাংলাদেশে পাটজাত পণ্য উৎপাদনের খরচ এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি।
তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে কম দামে ভারতে পণ্য বিক্রি করে বাজার দখলের যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, ভারতের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অতীতেও বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে পাটজাত পণ্যের রপ্তানি কমেছে। ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে শুধু বাজারমূল্য বা ডাম্পিংকে কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
নতুন অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক কার্যকর হওয়ার ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশি পাটপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ রপ্তানিতে এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

