বঙ্গোপসাগরের অনাবিষ্কৃত হাইড্রোকার্বন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে দেশের সর্বশেষ অফশোর বিডিং রাউন্ডে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) ২০২৬-এর প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যিক শর্তও বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। এই বিডিং রাউন্ডে মোট ২৬টি সাগরবক্ষের ব্লক বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড এনার্জিজ সামিটের স্ট্র্যাটেজিক স্টেজের একটি মন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশনে এই বিনিয়োগ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬-এ অংশ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়।
উন্মুক্ত ২৬টি ব্লকের মধ্যে ১১টি অগভীর পানির এবং ১৫টি গভীর পানির। গভীর সমুদ্রের ব্লকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রযুক্তি ও বড় অঙ্কের পুঁজি সরকারের বড় প্রয়োজন।
অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের কারণে জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে দেশীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোকে চলমান বিডিং রাউন্ডে অংশ নিতে আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর উপস্থাপনায় ছিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সহজ করতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বঙ্গোপসাগরের অনাবিষ্কৃত অফশোর সম্ভাবনা, আধুনিক সিসমিক তথ্যের প্রাপ্যতা এবং অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬-এর আওতায় দেওয়া বাণিজ্যিক শর্তগুলোও তুলে ধরে। প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের ভূতাত্ত্বিক ও সিসমিক তথ্য পর্যালোচনার অনুরোধ জানায়। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও তথ্যের জন্য সরাসরি সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং চলমান বিডিং প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বলা হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর চাপ বাড়তে থাকায় সরকার অফশোর অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
এই উদ্যোগ ঘিরে কয়েকটি বিষয় বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। দেশে গ্যাসের মজুত কমছে এবং আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানিতে বিপুল ডলার খরচ হয়, যা রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করে। তাই নিজস্ব উৎস খুঁজে বের করা এখন অর্থনৈতিক প্রয়োজনও বটে।
দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি ও সময়ের বাস্তবতা। সাগরবক্ষে অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে গভীর পানিতে কূপ খননের খরচ অনেক বেশি, আর সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই। বাণিজ্যিক মজুত মিললেও উৎপাদনে যেতে সাধারণত বছরের পর বছর সময় লাগে। ফলে চলমান জ্বালানি সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান এখান থেকে আসবে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
তৃতীয়ত, বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো শুধু সম্ভাবনা দেখে আসে না। তারা দেখে চুক্তির শর্ত কতটা লাভজনক, নীতিগত ধারাবাহিকতা আছে কি না এবং অর্থ পরিশোধ ও মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা কেমন। আগে বিভিন্ন সময়ে বিডিং রাউন্ডে সাড়া আশানুরূপ ছিল না বলে অভিযোগ আছে। তাই এবারের মডেল পিএসসির শর্ত কতটা আকর্ষণীয়, তা-ই নির্ধারণ করবে কতগুলো কোম্পানি এগিয়ে আসে।
চতুর্থত, তথ্যের স্বচ্ছতা। প্রতিনিধিদলের আধুনিক সিসমিক তথ্যের প্রাপ্যতার কথা বলা ইতিবাচক। কোম্পানিগুলো ঝুঁকি মূল্যায়নে এই তথ্যের ওপর অনেকটা নির্ভর করে। তথ্য যত নির্ভরযোগ্য ও সহজলভ্য হবে, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত তত সহজ হবে।
পঞ্চমত, জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়। উৎপাদন-বণ্টন চুক্তিতে দেশের হিস্যা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ টানার তাগিদে চুক্তির শর্ত এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দেশ ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হয়। শর্তগুলো জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে জানানো হলে জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।
সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান দেশের জ্বালানি ভবিষ্যতের জন্য একটি আশাজাগানিয়া সম্ভাবনা। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে আকর্ষণীয় ও স্বচ্ছ শর্ত, নীতির ধারাবাহিকতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপর। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে বিকল্প ব্যবস্থাও জোরদার রাখা প্রয়োজন।

