চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি এবার আন্তর্জাতিক কোনো টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে ১৫ বছরের জন্য প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত খসড়া কনসেশন চুক্তিটি অনুমোদন করা হয়। চুক্তির আওতায় এনসিটির পাশাপাশি ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডও পরিচালনার বিষয়টি থাকছে।
তবে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ইতোমধ্যে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক শ্রমিক সংগঠন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন মহল এর প্রতিবাদ জানিয়েছে।
মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের নথিতে সম্ভাব্য বিদেশি অপারেটরের নাম উল্লেখ করা হয়নি। চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হবে, সে বিষয়েও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কিংবা বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো সময়সূচি জানানো হয়নি।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দেওয়া এক বিবৃতিতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনটির সমন্বয়ক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির ও মোহাম্মদ ইব্রাহিম খোকন স্বাক্ষরিত ওই বিবৃতিতে এনসিটির সরঞ্জাম পুরোনো এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়—এমন বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করা হয়।
সংগঠনটির অভিযোগ, এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের পরিবেশ তৈরি করতেই এসব যুক্তি সামনে আনা হচ্ছে। তাদের দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার বাইরে চলে যাওয়া এবং বন্দরের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দাবি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি থেকে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব এবং প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা নিট আয় হয়েছে। তাদের মতে, বিদেশি অপারেটরের হাতে টার্মিনালটি তুলে দেওয়া হলে সরকারের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বন্দরের কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে তারা চুক্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।
এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০১৯ সালে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। পরে ২০২৩ সালের মার্চে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারও এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত করার পর্যায়ে গিয়েছিল। তবে বন্দর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেই উদ্যোগ স্থগিত করা হয়।
এরপর এপ্রিল মাসে দুবাইয়ে বাংলাদেশ ও দুবাইয়ের চতুর্থ যৌথ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বৈঠকে এনসিটি পরিচালনার বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। নতুন সরকারও এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। জুন মাসে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এনসিটি-সংক্রান্ত আলোচনা কমিটিকে সহায়তার জন্য ১২ সদস্যের একটি বিশেষ দল গঠন করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাই ডক লিমিটেড এনসিটি পরিচালনা করছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার পরিচালনাকারী স্থাপনাগুলোর একটি এই টার্মিনাল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৩৫ লাখ টিইইউ কনটেইনার পরিচালনা হয়েছে, যার ৪০ শতাংশের বেশি এসেছে এনসিটির মাধ্যমে।
প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে রয়েছে পাঁচটি জেটি। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই এই টার্মিনালে রয়েছে। ফলে দেশের কনটেইনার পরিবহনে এনসিটির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এনসিটির পরিচালনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। তবে চুক্তির শর্ত, অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং সরকারের সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

