জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর চালের পাইকারি বাজারে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চালের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন পাইকারি বিক্রেতারা।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম বেড়েছে। ধরনভেদে ৫০ কেজির বস্তায় মোটা চালের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে চিকন চালের বস্তায় দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা।
তবে পাইকারি বিক্রেতাদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখনো খুচরা পর্যায়ে পড়েনি। পুরোনো চালানের চাল শেষ হওয়ার পর খুচরা বাজারে নতুন দামের প্রভাব দেখা যেতে পারে।
পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, অনেক ব্যবসায়ীর কাছে এখনো ২০ দিন থেকে এক মাসের চাল মজুদ রয়েছে। নতুন দরের চালের সঙ্গে পুরোনো দামের চাল বিক্রি করলে ক্রেতা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
কেউ কেউ জানিয়েছেন, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্রেতা ধরে রাখতে তারা আগের তুলনায় কম মুনাফায় নতুন কেনা চালও পুরোনো দামে বিক্রি করছেন।
খোলা চালের দামের মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজারজাত করা দুই ও পাঁচ কেজির প্যাকেটজাত চালের দামও এখনো বাড়েনি।
গত ২০ সেপ্টেম্বর এক ধাক্কায় জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়। নতুন মূল্য অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ১১ দিন পর শুক্রবার রাজধানীর বাবুবাজার, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া ও মহাখালী বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন দামের চাল বাজারে আসতে শুরু করেছে।
রাজধানীর অন্যতম বড় চালের আড়ত যাত্রাবাড়ীর মেসার্স করিম রাইস এজেন্সির বিক্রয়কর্মী শাহ আলম বলেন, ২০ দিন আগে আটাশ চাল প্রতি বস্তা ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতেন। বর্তমানে তা বিক্রি করছেন ২ হাজার ১৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা দরে।
এ হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে মোটা চালের দাম প্রতি কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা।
শাহ আলম জানান, আটাশ জাতের মধ্যে সর্বনিম্ন দামের আতপ চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯৭৫ টাকায়।
বাজারে আটাশ, নাজিরশাইল, পাইজামসহ বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধ চাল বিভিন্ন কোম্পানির নামে বাজারজাত করা হয়। পাশাপাশি প্রায় সব মিল থেকেই মিনিকেট নামে চাল সরবরাহ করা হয়, যা মেশিনে কেটে সরু ও চকচকে করা হয়।
বর্তমানে মোটা জাতের আটাশ চাল খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৫ টাকা এবং চিকন চাল জাতভেদে ৬৫ থেকে ৭২ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কাটারিভোগ চালের দাম রয়েছে ৯০ টাকা কেজি।
এদিকে প্যাকেটজাত চিকন চালের ক্ষেত্রে পাঁচ কেজির প্যাকেটে প্রতি কেজির দাম পড়ছে ৯৫ টাকা থেকে ১০৫ টাকা।
শনির আখড়ার মেসার্স শফিক এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, “আটাশ চালের দাম ৫২ টাকা। সাধারণত ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি। কেউ বেশি নিলে ৫২ টাকা রাখি।”
তিনি জানান, আড়তে আটাশ জাতের চালের দাম বস্তাপ্রতি ১৫০ টাকা এবং চিকন চালের ক্ষেত্রে বস্তাপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
নতুন দামে চাল কিনে কত দামে বিক্রি করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমার এক কেজিতে খরচা বেশি পড়ছে তিন টাকার মতো। আমি খুচরা বিক্রি করি বেশি। গত তিন সপ্তাহে কোনো দাম বাড়াইনি।”
দাম না বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আগের দামেই বিক্রি করতে হবে আরও কিছু দিন। ঘরে (দোকানে) পুরনো চাল আছে, বাজার থেকে পুরনো চাল পুরোটা শেষ না হলে দাম ঠিক হবে না। এখন আগের চেয়ে লাভ কম হচ্ছে।”
অন্যদিকে মহাখালী কাঁচাবাজারের মেসার্স মানিক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মানিক মিয়া বলেন, “গত দুই সপ্তাহে আড়তে যাইনি। চাল যা আছে, তাতে আরও ১০-১৫ দিন চলবে। এর মধ্যে তো আমি দাম বাড়াব না। নতুন দামে কিনলে নতুন দামে বিক্রি করব।”
শনির আখড়ার দোকানি জাহাঙ্গীর হোসেন বিভিন্ন ধরনের চালের খুচরা দাম জানিয়ে বলেন, প্রতি কেজি আটাশ ৫৫ টাকা, মিনিকেট ৭০ টাকা, পাইজাম ৬৬ টাকা এবং নাজিরশাইল ৯০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।
তিনি বলেন, “আগের চেয়ে লাভ কমে গেছে। এক টাকা-দুই টাকা দাম বাড়ানো যায় না এলাকায়। আরও কিছু দিন আগের মতো দামেই বিক্রি করব। দেখা যাক, দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।”
একই ধরনের কথা জানিয়েছেন মহাখালী কাঁচাবাজারের শিমু ট্রেডার্সের বিক্রয়কর্মী আজিজুর রহমান। তিনি জানান, গুটি স্বর্ণা চাল প্রতি কেজি ৫২ টাকা দরে বিক্রি করছেন। গত এক মাস ধরে এই দামেই বিক্রি করছেন বলেও জানান তিনি।
পাইকারি বাজারে যাত্রাবাড়ীর চালের আড়তে মিনিকেট চালের বস্তা প্রতি ১৫০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটাশ চালের দাম বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
অন্যদিকে বাবুবাজার আড়তের চাঁদপুর ট্রেডার্সের আলিফ হোসেন বলেন, “একবারে তো চালের দাম বাড়ে না। ধীরে ধীরে বাড়ে। কতটা বাড়বে তা বলতে সময় লাগবে।”
বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কীভাবে বাড়ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটার আসলে কোনো হিসাব নাই। অনেকেই এত বেশি নিচ্ছে না। কাস্টমার বুঝে কারো কাছে ৫০, কারো কাছে ১০০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। সবাই গাড়ি ভাড়ার সঙ্গে মিলিয়ে করছে। এখনো দর স্থির হয়নি। আরও সময় লাগবে।”
বাবুবাজার আড়তের ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সিকদার জানান, একটি কোম্পানির মিনিকেট চালের বস্তা ৩ হাজার ৩৫০ টাকা এবং কাটারিভোগ চালের বস্তা ৪ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলেন তিনি।
তিনি বলেন, এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি পর্যায়ে ওই কোম্পানির মিনিকেট চালের দাম প্রতি বস্তায় ১৫০ টাকা বেড়েছে।
এই আড়তে মাঝারি মানের মিনিকেট চাল পাইকারি পর্যায়ে প্রতি বস্তা ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে আগের চেয়ে ১৫০ টাকা বেশি দরে আরেকটি কোম্পানির আটাশ চালের বস্তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।
বাজারে থাকা বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের পাঁচ কেজির প্যাকেটজাত চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮০ টাকা থেকে ৫২৫ টাকায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন।
রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঢাকা মহানগরের দৈনিক বাজার দর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার নাজিরশাইল ও মিনিকেট চাল প্রতি কেজি ৭২ থেকে ৮৫ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে।
এক মাস আগে এসব চালের দাম ছিল প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৮৫ টাকা। আর এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর, প্রতি কেজি চাল বিক্রি হয়েছে ৭৫ টাকা থেকে ৮৫ টাকা দরে।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪

