বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ইউরোপের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার পর ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাবিত চুক্তি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ৭ অক্টোবর চুক্তিটি স্বাক্ষর হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে দেশের জাতীয় বিমান সংস্থার বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে এয়ারবাসের প্রতিনিধিদের গত কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। শুক্রবারও দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলেছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার বড় অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং চুক্তিটি এখন শেষ পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে। ৭ অক্টোবরকে সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরের দিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে এই সম্ভাব্য চুক্তিকে শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনার একটি সাধারণ উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টির গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরকে বড় করা, দীর্ঘপাল্লার আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন নির্মাতার উড়োজাহাজ ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পরিচালনাগত ভারসাম্য তৈরি করার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোইংয়ের সঙ্গে একাধিক চুক্তির পর এয়ারবাসের সঙ্গে নতুন এই উদ্যোগটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে বোইংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য দুটি চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়েছে। এর মধ্যে নতুন এয়ারবাস চুক্তিকে বোইংনির্ভর বহর সম্প্রসারণের পাশাপাশি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিকল্প হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা বোইংয়ের সঙ্গে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য একটি সম্পূরক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় বিমানের বহরে পাঁচটি বোইং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার এবং ছয়টি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে ৩০ এপ্রিল স্বাক্ষরিত চুক্তিতে ছিল ১০টি বোইং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং দুটি ৭৩৭-৮ উড়োজাহাজ।
অর্থাৎ, বোইংয়ের সঙ্গে করা দুই দফার চুক্তির মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে যদি প্রস্তাবিত ১০টি এয়ারবাস যুক্ত হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির বহরের আকার বর্তমান অবস্থার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রস্তাবিত এয়ারবাস চুক্তিতে চারটি এ৩৫০-৯০০ প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও সরু দেহের উড়োজাহাজ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই দুই ধরনের উড়োজাহাজের অন্তর্ভুক্তি বিমানের ভবিষ্যৎ পরিচালন পরিকল্পনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজ দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক যাত্রায় ব্যবহার করা যায়, অন্যদিকে সরু দেহের উড়োজাহাজ তুলনামূলকভাবে স্বল্প ও মাঝারি দূরত্বের রুটে কার্যকর হতে পারে।
এখানেই বহর সম্প্রসারণের পরিকল্পনার একটি বড় দিক সামনে আসে। শুধু উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ালেই একটি বিমান সংস্থার সক্ষমতা বাড়ে না। কোন ধরনের উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, সেগুলো কোন রুটে ব্যবহার করা হবে, যাত্রী চাহিদা কতটা রয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত হবে এবং নতুন উড়োজাহাজগুলো কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যাবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এয়ারবাসের প্রস্তাবিত ১০টি উড়োজাহাজকে বিমানের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে। বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে এবং এর অধিকাংশই বোইংয়ের তৈরি। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বহরের আকার শুধু বাড়বে না, উড়োজাহাজের ধরন ও সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আসবে।
সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনা অনুযায়ী, বোইং ও এয়ারবাস মিলিয়ে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে বিমানের বহরে মোট ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থার বর্তমান পরিচালন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এত বড় বহর পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু ক্রয়চুক্তি সম্পন্ন করাই যথেষ্ট নয়। নতুন উড়োজাহাজের পাশাপাশি প্রয়োজন হবে দক্ষ পাইলট, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী এবং প্রশিক্ষিত জনবল। একই সঙ্গে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পরিচালন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের বিষয়গুলোও পরিকল্পিতভাবে সামলাতে হবে। নতুবা বড় বহর তৈরি হলেও তার পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বোইংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির সময়ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে শুল্ক বৃদ্ধির সম্ভাব্য চাপ এড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও বোইংয়ের সঙ্গে নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিকে দেখা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে এয়ারবাসের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি বাংলাদেশের উড়োজাহাজ সংগ্রহনীতিতে আরেকটি মাত্রা যোগ করছে।
একই সঙ্গে এয়ারবাস ও বোইংয়ের উড়োজাহাজ নিয়ে একটি মিশ্র বহর গড়ে উঠলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে ভবিষ্যতে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। দুই নির্মাতার উড়োজাহাজের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হতে পারে। ফলে নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থাপনাকে কীভাবে আরও দক্ষ করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্যদিকে, বহর বড় হওয়ার ফলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘ দূরত্বের রুটে যাত্রী চাহিদা থাকলে প্রশস্ত দেহের উড়োজাহাজগুলো সেই বাজার ধরতে সহায়তা করতে পারে। আবার আঞ্চলিক ও মাঝারি দূরত্বের রুটে সরু দেহের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে তুলনামূলকভাবে নমনীয় পরিচালনা সম্ভব হতে পারে। তবে কোন রুটে কোন উড়োজাহাজ ব্যবহার করা হবে, তার সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে যাত্রী চাহিদা, আসন ব্যবহারের হার এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর।
এ কারণে ৭ অক্টোবরের সম্ভাব্য এয়ারবাস চুক্তিকে শুধু আরেকটি উড়োজাহাজ কেনার খবর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভবিষ্যৎ বহর কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—নতুন উড়োজাহাজগুলো কত দ্রুত বহরে যুক্ত হবে এবং সেগুলোকে কতটা কার্যকরভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে।
সব মিলিয়ে, বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আগামী কয়েক বছরে একটি অনেক বড় বহরের সংস্থায় পরিণত হওয়ার পরিকল্পনা করছে। বোইংয়ের সঙ্গে ২৫টি উড়োজাহাজের দুটি চুক্তির পর এবার এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ সেই পরিকল্পনাকে আরও বিস্তৃত করছে। প্রস্তাবিত চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১নিও যুক্ত হলে বিমানের বহরে যেমন সক্ষমতার বৈচিত্র্য আসবে, তেমনি সামনে খুলতে পারে নতুন আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাবনাও।
তবে এই সম্প্রসারণের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে উড়োজাহাজের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সেগুলো কতটা লাভজনক ও দক্ষভাবে পরিচালনা করা যায় তার ওপর। ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৫টি নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য তাই শুধু ক্রয় পরিকল্পনা নয়; এটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন, আর্থিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের পরীক্ষা। আগামী ৭ অক্টোবরের সম্ভাব্য চুক্তি সেই বড় পরিকল্পনার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে।

