বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাতে নতুন অর্থবছরের শুরুটা মিশ্র হলেও প্রথম তিন মাস শেষে প্রবৃদ্ধির চিত্র ইতিবাচক হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ মার্কিন ডলার। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬.১০ শতাংশ।
তিন মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রবৃদ্ধি একেবারে শুরু থেকেই সমান গতিতে আসেনি। জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি কমেছিল। এরপর আগস্টে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা যায় এবং সেপ্টেম্বরেও সেই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকে। ফলে প্রথম মাসের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক তিন মাসের হিসাবে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে পোশাক খাত।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৫৯৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৫৫৮ কোটি ডলার। ফলে নিট পোশাক রপ্তানিতে এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬.৮৮ শতাংশ।
অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকেও আয় বেড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৬১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে আয় হয়েছিল ৪৩৯ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ ওভেন পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.১১ শতাংশ।
এই হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রথম প্রান্তিকে নিট পোশাকের প্রবৃদ্ধি ওভেন পোশাকের তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল। মোট পোশাক রপ্তানি আয়ে দুই ধরনের পণ্যেরই ইতিবাচক অবদান রয়েছে। ফলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পোশাকের ওপর নির্ভর করেনি।
তবে তিন মাসের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে সেপ্টেম্বর মাসে। এ মাসে বাংলাদেশ মোট ৩০৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এ আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮.৫৬ শতাংশ।
সেপ্টেম্বরের এই প্রবৃদ্ধি নিট ও ওভেন—দুই ধরনের পোশাকেই প্রায় সমানভাবে দেখা গেছে। মাসটিতে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৭৭ কোটি ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১৬৩ কোটি ১ লাখ ডলার। ফলে নিট পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৫৮ শতাংশ।
একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৩১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ১২০ কোটি ৯৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ ওভেন পোশাক রপ্তানিতেও ৮.৫৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগের মাসগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির চিত্রে বেশ ওঠানামা ছিল। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি বরং কমে গিয়েছিল। ওই মাসে মোট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আগের বছরের জুলাইয়ে এ আয় ছিল ৩৯৬ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে জুলাইয়ে রপ্তানি আয় কমেছিল ১.৯২ শতাংশ।
জুলাইয়ের দুর্বল ফল শুধু সামগ্রিক পোশাক রপ্তানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ওই মাসে নিট পোশাক রপ্তানি কমেছিল ০.৯০ শতাংশ। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমে ৩.১৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থবছরের শুরুতে পোশাক খাতের দুই প্রধান অংশেই রপ্তানি আয়ে কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছিল।
কিন্তু আগস্টে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ওই মাসে মোট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি ৮৯ লাখ ডলার। গত বছরের আগস্টে আয় ছিল ৩১৬ কোটি ৮ লাখ ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টে পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৩.৯২ শতাংশ।
আগস্টের প্রবৃদ্ধিতে নিট পোশাকের অবদানও উল্লেখযোগ্য ছিল। এ মাসে নিট পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৪.৮৮ শতাংশ। একই সময়ে ওভেন পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১২.৭০ শতাংশ। অর্থাৎ জুলাইয়ের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির পর আগস্টে পোশাক খাতের দুই অংশেই শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখা যায়।
এরপর সেপ্টেম্বরেও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় প্রথম তিন মাসের সামগ্রিক হিসাব ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। তিন মাসের তথ্য বলছে, জুলাইয়ের তুলনামূলক দুর্বল অবস্থার পর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে রপ্তানি বাড়ার কারণে পোশাক খাত শেষ পর্যন্ত ৬.১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রথম প্রান্তিক শেষ করেছে।
তবে শুধু পোশাক খাতের পরিসংখ্যান দেখলে সামগ্রিক রপ্তানি পরিস্থিতির পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ মোট পণ্য রপ্তানি করে ১ হাজার ৩০৯ কোটি ৪১ লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ১ হাজার ২৩১ কোটি ৩১ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে দেশের সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬.৩৪ শতাংশ।
অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধিও ইতিবাচক ছিল। পোশাক খাত বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হওয়ায় এ খাতের আয় বৃদ্ধি সামগ্রিক রপ্তানি চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
তবে তিন মাসের প্রবৃদ্ধিকে সামনে রেখে পুরো অর্থবছরের রপ্তানি পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত ধারণা করার সময় কিছুটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ মাসভেদে পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা যাচ্ছে। জুলাইয়ে যেখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল, সেখানে আগস্টে ১৩.৯২ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বরে ৮.৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এসেছে। অর্থাৎ বাজারের চাহিদা ও রপ্তানি আদেশের পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে পরবর্তী মাসগুলোর হিসাবেও পরিবর্তন আসতে পারে।
তারপরও আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ধারাবাহিক ইতিবাচক ফল পোশাক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশ করছে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বর মাসে নিট ও ওভেন—উভয় ধরনের পোশাকেই ৮ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়া দেখাচ্ছে যে ওই মাসে সামগ্রিক রপ্তানি কার্যক্রম আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি ছিল।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধির প্রভাবও ব্যাপক। পোশাক রপ্তানি থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে বড় ভূমিকা রাখে। তাই এ খাতে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে তা সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ফলে শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়লেই দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না। পণ্যের বৈচিত্র্য, উৎপাদন সক্ষমতা, সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান অন্তত এটুকু দেখাচ্ছে যে জুলাইয়ের দুর্বল শুরু কাটিয়ে পোশাক রপ্তানি আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে। ৬.১০ শতাংশ সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি সেপ্টেম্বরে ৮.৫৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং আগস্টে ১৩.৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খাতটির সাম্প্রতিক গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিচ্ছে।
সামনের মাসগুলোতে এই প্রবৃদ্ধির ধারা কতটা স্থায়ী হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। প্রথম প্রান্তিকের ফলাফল ইতিবাচক হলেও পুরো অর্থবছরের চিত্র নির্ভর করবে পরবর্তী মাসগুলোর রপ্তানি আদেশ, আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা এবং দেশের পোশাক শিল্পের উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতার ওপর। আপাতত তিন মাসের হিসাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় ৬.১০ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৭ কোটি ৮৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে—যা নতুন অর্থবছরের শুরুতে খাতটির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান।

