আমদানিনির্ভর ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে দ্রুত ঋণপত্র (এলসি) খুলে আমদানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ৫২০ টাকায় পৌঁছানোর কারণ ব্যাখ্যা করতে বলেছেন তিনি। অস্বাভাবিক দামে বিক্রির প্রমাণ মিললে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। খেজুরের শুল্ক-কর নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তও এ সপ্তাহেই জানানো হবে বলে জানান তিনি।
শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলা এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম। আরও ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।
মন্ত্রী ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে চান, আমদানি মূল্য, শুল্ক-কর ও অন্যান্য খরচ ধরার পরও খুচরা বাজারে মাল্টার দাম কীভাবে কেজিপ্রতি ৫২০ টাকা হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না। কেউ অস্বাভাবিক দামে বিক্রি করছেন, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর ব্যবস্থা নেবে।
ব্যবসায়ীরা অবশ্য দাম বাড়ার বড় কারণ হিসেবে সরবরাহ ঘাটতির কথা বলেছেন। তাঁদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার প্রয়োজন হয়। আমদানিকারকদের ভাষ্য, উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেকেই আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন। মাল্টা পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় বড় আর্থিক ঝুঁকিও থাকে বলে তাঁরা জানান।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মন্ত্রী মাল্টার শুল্ক-সংক্রান্ত বিষয়টি পর্যালোচনার আশ্বাস দেন। তিনি বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়াতে এবং দ্রুত এলসি খুলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে তাগিদ দেন। আসন্ন চাহিদার কথা বিবেচনা করে এখন থেকেই খেজুর আমদানির প্রস্তুতি নিতেও বলেন তিনি।
সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফল আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানিপ্রক্রিয়ার যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
সভায় দুটি ভিন্ন সুর স্পষ্ট। সরকার দামের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, আর ব্যবসায়ীরা বলছেন সংকটের মূলে সরবরাহ ঘাটতি ও উচ্চ আমদানি খরচ। দুটি দাবিই একসঙ্গে সত্য হতে পারে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকলে দাম বাড়ে। আবার সেই সুযোগে কেউ কেউ বাড়তি মুনাফা তুলে নিতে পারেন।
ব্যবসায়ীদের দেওয়া সংখ্যায় সরবরাহের ব্যবধান বেশ বড়। প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার চাহিদা ধরলে সপ্তাহে প্রয়োজন প্রায় ১০৫ কনটেইনার। অথচ কোনো কোনো সপ্তাহে এসেছে ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার। এটি প্রয়োজনের একটি ক্ষুদ্র অংশ। এই হিসাব সত্য হলে দামের ঊর্ধ্বগতি অপ্রত্যাশিত নয়। তবে এ তথ্য ব্যবসায়ীদের নিজস্ব হিসাব। কাস্টমস ও বন্দরের প্রকৃত আমদানি তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার।
আমদানি কমে যাওয়ার কারণগুলোর মধ্যে শুল্ক সরকারের হাতে থাকা বিষয়। শুল্ক যৌক্তিক করলে আমদানিকারকদের ঝুঁকি কমতে পারে এবং সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে শুল্ক কমালেই দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সেই সুবিধা ভোক্তার কাছে পৌঁছাল কি না, তা নজরে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমদানি থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের মূল্যসংযোজনের হিসাব স্বচ্ছভাবে দেখা জরুরি।
ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ একটি সতর্কবার্তা। তবে সরবরাহ সংকটের সময় শুধু জরিমানা বা অভিযানে দাম কমানো কঠিন। অভিযান সাময়িক চাপ তৈরি করলেও সরবরাহ না বাড়লে বাজার আবার আগের অবস্থায় ফিরতে পারে। আবার সুযোগসন্ধানী মুনাফা ঠেকাতে নজরদারিও দরকার। তাই সরবরাহ বাড়ানো ও নজরদারি, দুটি একসঙ্গে চলা প্রয়োজন।
পচনশীল পণ্যের আমদানিতে বন্দরের দীর্ঘসূত্রতা বড় সমস্যা। ছাড়ে দেরি হলে ফল নষ্ট হয়, আর সেই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত দামে যুক্ত হয়। তাই পচনশীল ফলের জন্য দ্রুত শুল্কায়ন ও খালাসের বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
খেজুরের বিষয়টিও লক্ষণীয়। আসন্ন চাহিদার আগেই শুল্ক সিদ্ধান্ত জানালে আমদানিকারকেরা সময়মতো এলসি খুলতে পারবেন। দেরি হলে মাল্টার মতো সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখন নজর থাকবে মাল্টার শুল্ক পর্যালোচনার ফল এবং এ সপ্তাহে খেজুরের শুল্ক-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। আগামী কয়েক সপ্তাহে বিকল্প উৎস থেকে মাল্টার চালান আসে কি না, সেটিও দেখার বিষয়। সরবরাহ বাড়লে দাম কমে কি না এবং ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তর কোনো ব্যবস্থা নেয় কি না, তা-ই ঠিক করবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হলো।

