বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালগুলো পরিচালনার দায়িত্ব ধীরে ধীরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাচ্ছে। দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামোতে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করার উদ্যোগকে সরকার দেখছে আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে শ্রমিক সংগঠন ও বন্দর সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও বিরোধিতা।
ইতোমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, লালদিয়ার চর এবং পানগাঁও আইসিডি টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় দেশের সবচেয়ে বড় একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং কেন্দ্র নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটিও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে পরিচালনার জন্য দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে।
অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার পথ আরও সহজ হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল, জেনারেল কার্গো বার্থ এবং বে পোর্ট-মাল্টিপারপাস টার্মিনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও বিদেশি অপারেটর নিয়োগের আলোচনা চলছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশ্বের অভিজ্ঞ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়বে। এতে কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, পণ্য খালাসের গতি এবং সামগ্রিক বন্দর পরিচালনার দক্ষতা উন্নত হবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং আধুনিক কর্মপরিবেশ চালু হবে। তাদের মতে, দেশের দ্রুত বাড়তে থাকা আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সামাল দিতে শুধু বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো প্রয়োজন।
সরকার জানিয়েছে, ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্ন টার্মিনালের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারী সংগঠনগুলোর মধ্যে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা দাবি করছেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালনার সুযোগ পেলে স্থানীয় শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে তারা মনে করছেন, দেশের কৌশলগত অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত বিদেশি নির্ভরতা তৈরি হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
শ্রমিক নেতারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগের আগে সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত অর্থনৈতিক মূল্যায়ন, সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সাধারণ মানুষের সামনে প্রকাশ করা উচিত।
এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ইতোমধ্যে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করেছে। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর রক্ষা কমিটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
শ্রমিক সংগঠনগুলো হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল না করা হয়, তাহলে তারা আরও বড় আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করবে। একই সঙ্গে অতীতে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে তারা।
অন্যদিকে সরকারের যুক্তি হলো, বিশ্বের বড় বড় বন্দরের পরিচালনায় বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অপারেটরদের অংশগ্রহণ একটি স্বাভাবিক বিষয়। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরিচালনায় বিদেশি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। আন্তর্জাতিক দক্ষতা গ্রহণের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। তাই এর আধুনিকায়ন যেমন জরুরি, তেমনি এর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, বিদেশি অপারেটর যুক্ত হওয়ার এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আনে, নাকি এটি আরও বড় বিতর্কের জন্ম দেয়।

