বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য ও মসলার আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। গুণগত মান, স্বাদ এবং বৈচিত্র্যের কারণে দেশের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য এখন ইউরোপের বাজারেও জায়গা করে নিচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে এবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে রপ্তানি হয়েছে ২৪ টন ওজনের একটি বড় খাদ্যপণ্যের চালান।
বাংলাদেশের রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেড এই চালানটি পাঠিয়েছে। এতে রয়েছে দেশের উৎপাদিত বিভিন্ন মসলা, সুগন্ধি চাল, বাসমতি চাল এবং প্রথমবারের মতো রপ্তানি করা হচ্ছে জনপ্রিয় খাদ্যপণ্য লাচ্ছা সেমাই।
ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত ওয়াক ফুড গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেডের মাধ্যমে এসব পণ্য ইউরোপের বাজারে পৌঁছাবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ধরনের রপ্তানি বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার ৩০ সেপ্টেম্বর খাদ্যপণ্য ভর্তি ৪০ ফুটের একটি কনটেইনার জাহাজে তোলা হয়েছে। সমুদ্রপথে প্রায় ৪৫ দিনের যাত্রা শেষে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে পণ্যগুলো ফ্রান্সের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এর আগে রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা পণ্যগুলো চট্টগ্রামের ইসহাক ডিপোতে নেওয়া হয়। সেখানে কাভার্ড ভ্যান থেকে পণ্যগুলো ৪০ ফুটের কনটেইনারে ভর্তি করা হয়। পরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ও বন্দরের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে কনটেইনারটি জাহাজে তোলা হয়।
ব্যবসায়ীদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের চাহিদা তৈরির পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় ভোক্তারা। তবে শুধু প্রবাসী জনগোষ্ঠী নয়, পণ্যের গুণগত মান ও স্বাদের কারণে অন্য দেশের ক্রেতাদের মধ্যেও বাংলাদেশি মসলা ও খাদ্যপণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
বিশেষ করে শুকনা খাবার, প্রক্রিয়াজাত মসলা এবং ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং এবং আন্তর্জাতিক খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলতে পারলে ইউরোপের বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
এবারের চালানে লাচ্ছা সেমাই যুক্ত হওয়াকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ বাংলাদেশে জনপ্রিয় এই খাদ্যপণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইউরোপের ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী মান বজায় রাখতে পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পণ্যের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
ওয়াক অ্যান্ড এসএ লিমিটেডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন এবং বাছাইয়ের মাধ্যমে মানসম্মত পণ্য বিদেশে পাঠান। তাদের পাঠানো পণ্য ফ্রান্সের বিভিন্ন বাজার ও সুপারশপে বিক্রি হয়।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. মিনহাজ বলেন, ইউরোপের মতো উন্নত বাজারে খাদ্যপণ্য রপ্তানি দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মানসম্মত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে রপ্তানি আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, দেশের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ফ্রান্সে খাদ্যপণ্য রপ্তানি করতে চাইলে তাদের সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
তবে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো পণ্যের মান নিশ্চিত করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো খাদ্য নিরাপত্তা ও গুণগত মানের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয় না। কোনো চালানে মানের সমস্যা পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে সেই পণ্যের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে নিয়মিত রপ্তানি করা গেলে বাংলাদেশ শুধু মসলা নয়, বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বড় সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে ১৭ ধরনের মসলা দেশে উৎপাদিত হয়। লাভজনক হওয়ায় দেশে মসলা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানিতে ব্যবসায়ীদের আগ্রহ বাড়ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মসলা রপ্তানি করা হচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, ইরাক, মালয়েশিয়া ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে বাংলাদেশি মসলার বাজার রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন ধরনের মসলা রপ্তানি হয়—আস্ত মসলা, গুঁড়া মসলা এবং মিশ্র মসলা। হলুদ, শুকনা মরিচ, ধনে বীজ, কালোজিরা, মিষ্টি জিরা, মেথি ও তিল উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে।
দেশের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বিশ্বের ৩০টির বেশি দেশে মসলা রপ্তানি করছে। ফলে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য খাত শুধু অভ্যন্তরীণ বাজার নয়, বৈশ্বিক বাজারেও নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
বর্তমানে দেশের মসলার বাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। দেশে বছরে প্রায় ৩৩ লাখ থেকে ৪৭ লাখ টন পর্যন্ত মসলার চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয় প্রায় ২৭ লাখ টন, আর চাহিদার বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বিশেষ করে জিরা, এলাচ, দারচিনি ও লবঙ্গের মতো গরম মসলার বড় অংশ বিদেশ থেকে আসে। তবে দেশের কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এসব পণ্যের পাশাপাশি নতুন নতুন খাদ্যপণ্যও আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিতে পারে।
প্যারিসে পাঠানো ২৪ টনের এই চালান তাই শুধু একটি রপ্তানি কার্যক্রম নয়, বরং বাংলাদেশের খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মান, নিরাপত্তা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে দেশের কৃষক, উদ্যোক্তা এবং অর্থনীতি—সবাই এর সুফল পেতে পারে।

