দীর্ঘ প্রায় আট দশক পর ভারতের আসাম থেকে সরাসরি বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে পণ্যবাহী নৌযাত্রা শুরু হয়েছে। আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ বাংলাদেশের ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর উচ্চ আসাম অঞ্চল থেকে কোনো বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে এটিই প্রথম পণ্যবাহী চালান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার জাহাজটির যাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথবিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যুক্ত হন।
জাহাজে বহন করা মিথানল উৎপাদন করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড। আসামের নামরূপে উৎপাদিত এই রাসায়নিক পণ্য শেষ পর্যন্ত ঢাকার পানগাঁও বন্দরে পৌঁছাবে।
এই যাত্রাপথ শুধু একটি পণ্য পরিবহনের ঘটনা নয়, বরং আসাম, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং বাংলাদেশের নদীপথনির্ভর বাণিজ্যের সম্ভাবনার নতুন পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রকে আবারও নিয়মিত আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের একটি কার্যকর পথ হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না, এই যাত্রা তার বাস্তব সক্ষমতার বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
জাহাজটি প্রথমে ব্রহ্মপুত্রের জাতীয় জলপথ-২ ধরে প্রায় ৭৬৮ কিলোমিটার অতিক্রম করে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পৌঁছাবে। এরপর ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল নৌপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করবে।
বগিবিল থেকে ঢাকার নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথের বড় একটি অংশ নদীপথে অতিক্রম করা হবে, যা স্থলপথের তুলনায় ভারী পণ্য পরিবহনে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই যাত্রাকে ঘিরে আসামে ঐতিহাসিক গুরুত্বও তুলে ধরা হচ্ছে। একসময় ডিব্রুগড় ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দর। ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে সরকারি স্টিমার ডিব্রুগড়ে পৌঁছাতে শুরু করেছিল ১৮৫৬ সালের মধ্যেই। পরে ১৮৮২ সালে ডিব্রুগড় স্টিমার ঘাট থেকে ডিব্রু-সাদিয়া রেলপথ চালু হয়।
১৯১৩ সালের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ধরে ডিব্রুগড় পর্যন্ত প্রতিদিন স্টিমার চলাচল করত। এসব স্টিমারে চা, কাঠ এবং যাত্রী পরিবহন করা হতো। অর্থাৎ সেই সময় নদীপথই ছিল উচ্চ আসামের অর্থনীতি ও বৃহত্তর বাজারের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর সেই বাণিজ্যিক নৌসংযোগ বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে। আসামের পণ্য কলকাতায় নিতে হলে তখন পূর্ব পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে হতো। এতে পুরোনো বাণিজ্যপথের ধারাবাহিকতা ভেঙে যায়।
এরপর ১৯৫০ সালের ভূমিকম্প ডিব্রুগড়ের আশপাশে নদীর গতিপথ ও তলদেশেও পরিবর্তন ঘটায়। এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনও নৌচলাচলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ডিব্রুগড় ঘাট থেকে নিয়মিত পণ্য বুকিং বন্ধ হয়ে যায় ১৯৫৪ সালে। এরপর ১৫ অক্টোবর ১৯৫৬ সালে ঘাটটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন চা পরিবহনের বড় অংশ ধীরে ধীরে রেলপথে স্থানান্তরিত হচ্ছিল।
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সীমান্তপারের নদীবাণিজ্যে নতুন করে বিরতি সৃষ্টি করে। ফলে একসময় যে নদীপথ আসামকে বৃহত্তর অঞ্চলের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছিল, তা কয়েক দশক কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নদীবাণিজ্য পুনরুজ্জীবনের সুযোগ তৈরি হয়। ভারত ও বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে একটি নদীবাণিজ্য প্রটোকল স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে ব্রহ্মপুত্রের সাদিয়া থেকে ধুবরি পর্যন্ত ৮৯১ কিলোমিটার অংশকে জাতীয় জলপথ-২ ঘোষণা করা হয়।
তবে কাগজে নদীপথের স্বীকৃতি মিললেও নিয়মিত পণ্য পরিবহন ফিরে আসতে আরও অনেক সময় লাগে। ডিসেম্বর ২০১৭ সালে পান্ডু থেকে ধুবরি পর্যন্ত সিমেন্ট পরিবহনের মাধ্যমে নিয়মিত পণ্য চলাচল আবার শুরু হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পথে নৌচলাচল ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফেব্রুয়ারি ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ বাংলাদেশ হয়ে পান্ডুতে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে গঙ্গা বিলাস নামের একটি নদীভ্রমণ জাহাজ বারাণসী থেকে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ডিব্রুগড় পর্যন্ত যাত্রা করে।
বর্তমান মিথানলবাহী জাহাজটির যাত্রা এই ধারাবাহিকতার আরও বড় ধাপ। কারণ এটি শুধু ভারতীয় অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহন নয়, বরং আসামের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর একটি বাস্তব উদ্যোগ।
বগিবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছিল জুলাই ২০২৩ সালে। টার্মিনালটি চালু হয় ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে। এর পর ডিসেম্বর ২০২৪ সালে ‘জলবাহক’ নামে পণ্য পরিবহন উৎসাহ কর্মসূচি চালু করা হয়।
ভারতের বন্দর, নৌপরিবহন ও জলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহন ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের জলপথ অবকাঠামো উন্নয়নে ৬৮ বিলিয়ন রুপির বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা হচ্ছে, যা প্রায় ৭৭ কোটি মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে জাতীয় জলপথ-২-এর উন্নয়ন, পান্ডুতে জাহাজ মেরামত সুবিধা এবং পান্ডু বন্দরের সঙ্গে শেষ প্রান্তের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা।
নদীপথ ব্যবহারের অর্থনৈতিক গুরুত্বও এখানে বড়। ভারী পণ্য সড়কপথে পরিবহনের ক্ষেত্রে বড় সংখ্যক ট্রাক, জ্বালানি এবং সড়ক অবকাঠামোর প্রয়োজন হয়। নদীপথে একই পরিমাণ পণ্য বড় জাহাজ বা বার্জে বহন করা গেলে জ্বালানি খরচ ও সড়কের ওপর চাপ কমতে পারে।
এই কারণে আসাম থেকে বাংলাদেশমুখী বর্তমান যাত্রা শুধু প্রতীকী সাফল্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ পণ্য পরিবহন ব্যয়ের একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিকভাবে দেশের মূল অংশের সঙ্গে একটি সংকীর্ণ স্থল করিডরের মাধ্যমে যুক্ত। ফলে এই অঞ্চলের পণ্যকে বাংলাদেশের নদীপথ ও বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে নেওয়া গেলে পরিবহন দূরত্ব ও সময় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এর আলাদা অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রটোকল নৌপথের ব্যবহার বাড়লে দেশের নদীবন্দর, নৌপরিবহন ব্যবস্থা, জাহাজসেবা এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নতুন চাহিদা তৈরি হতে পারে। এতে ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে নাব্যতা, বন্দর অবকাঠামো, শুল্ক প্রক্রিয়া, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত সময়সূচিভিত্তিক নৌপরিবহনের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একটি বা দুটি সফল যাত্রা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক পথের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয় না। নিয়মিত পণ্য পরিবহন, সময় ও খরচের পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং দুই দেশের প্রশাসনিক সমন্বয় এখানে বড় ভূমিকা রাখবে।
ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে আঞ্চলিক জলপথ সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। ফলে আসাম থেকে বাংলাদেশে এই পণ্যবাহী জাহাজের যাত্রাকে বৃহত্তর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সংযোগ পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা যায়।
বর্তমান যাত্রায় ভারতের অভ্যন্তরীণ জলপথ কর্তৃপক্ষ, আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস, কোচিন বাঙ্কার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট অংশীদাররা যুক্ত রয়েছে। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দেখায় যে এটি শুধু একটি পরিবহন কার্যক্রম নয়, বরং একাধিক দেশের বাণিজ্য ও নৌপরিবহন ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই যাত্রার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। যে ডিব্রুগড় একসময় ব্রহ্মপুত্রনির্ভর বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল, দেশভাগ, ভূমিকম্প এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে সেই অবস্থান দীর্ঘদিন হারিয়ে ফেলেছিল। এখন একই নদী ধরে আবার বিদেশি বন্দরের উদ্দেশে পণ্য যাত্রা শুরু হওয়া অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথকে আধুনিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ৫৪০ মেট্রিক টন মিথানল নিয়ে বগিবিল থেকে ঢাকার পানগাঁও বন্দরের উদ্দেশে এই যাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার নদীবাণিজ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের এই নৌপথ যদি নিয়মিত ও বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়, তাহলে আসামসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশের নদীপথ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশও আঞ্চলিক নৌবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে নতুন সুযোগ পেতে পারে। তাই এই প্রথম যাত্রার প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে তখনই, যখন এর পর নিয়মিতভাবে আরও পণ্যবাহী জাহাজ এই পথে চলাচল করবে এবং নদীপথটি দুই দেশের জন্য একটি স্থায়ী ও কার্যকর বাণিজ্যপথে পরিণত হবে।

