বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও কাগজবিহীন ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমানো, সেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত করা এবং দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দরের কার্যক্রম আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে বিদ্যমান ডিজিটাল সেবাগুলো সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বিভাগের আলাদা আলাদা ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা এবং বাকি থাকা ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তর কার্যক্রম আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামিম বলেন, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, শিপিং কোম্পানি, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট, পরিবহন প্রতিষ্ঠান, কাস্টমস ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করতে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রয়োজন।
বর্তমানে বন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ইতোমধ্যে অনলাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে জাহাজসংক্রান্ত সব বিল শতভাগ অনলাইনে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে। নতুন ওয়ান-স্টপ সেবা কেন্দ্রের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক পিএলসির একটি সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে কনটেইনার ও গ্রাহক বিলিং ব্যবস্থাকে টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আমদানিকারক ও তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা দিন-রাত যেকোনো সময় অনলাইনে বন্দরের ফি পরিশোধ করতে পারবেন। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির দিনেও এই সুবিধা চালু থাকবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না হলে ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়াও চালু করা হবে।
আমদানি করা কনটেইনারের ডেলিভারি অর্ডার ব্যবস্থাপনাও ডিজিটাল করা হচ্ছে। টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আসাইকুডা ওয়ার্ল্ড ব্যবস্থাকে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকারকেরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিয়ে অনলাইনে নথির অগ্রগতি জানতে পারবেন।
বন্দরের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে যানজট কমাতে চালু করা হচ্ছে সময়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, অনলাইন কার্ট টিকিট এবং ই-গেট পাস ব্যবস্থা। পাশাপাশি ইকুইপমেন্ট ইন্টারচেঞ্জ রিসিপ্টের সঙ্গে ই-গেট পাস যুক্ত করা হবে।
বিশেষ ডেলিভারি, কাস্টমস নিলামের পণ্য সরবরাহ এবং অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো কার্যক্রমও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমস ব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিগত সংযোগের মাধ্যমে সমন্বিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ২০২৫ সালে এই বন্দর দিয়ে রেকর্ড ৩৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ টন সাধারণ পণ্য এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ পরিচালনা করা হয়েছে। দেশের সমুদ্রপথে পরিবহন করা সাধারণ পণ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনার বাণিজ্যের প্রায় ৯৮ শতাংশ এই বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে চালু করা হয়েছে পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো-সিপিএ স্কাই প্ল্যাটফর্ম। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা একটি মাত্র লগইনের মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। পাশাপাশি ডিজিটাল রাডার ও জাহাজ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজের অবস্থানও实时 দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আধুনিক বন্দর শুধু বড় অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না, বরং দ্রুত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই এর মূল শক্তি। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ আগমন, পণ্য খালাস, শুল্ক কার্যক্রম, অর্থ পরিশোধ এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর সম্পূর্ণ ডিজিটাল হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমবে, পণ্য পরিবহনে গতি বাড়বে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চাপ সামলাতে এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট লজিস্টিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে চট্টগ্রাম বন্দরের এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

