ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যকে ভবিষ্যতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায় ঢাকা। এ জন্য বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, রপ্তানি পণ্যের পরিধি বাড়ানো এবং বাজার প্রবেশের বাধা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুকতাদির ইন্দোনেশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আনিস মাত্তার সঙ্গে বৈঠকে এই লক্ষ্য তুলে ধরেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে রপ্তানি বৃদ্ধি, বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। তবে এই বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার। ফলে দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে রপ্তানি বাড়ানো।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজার প্রবেশের বাধাগুলো দূর করা গেলে বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি করা সম্ভব। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ এবং কৃষিপণ্য খাতে বাংলাদেশের বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় রপ্তানি খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়ার বাজারে এই খাতের আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন করছে এবং বিশ্বের শতাধিক দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে। ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি ওষুধ প্রবেশ সহজ করতে দেশটির ওষুধ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা।
দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবিত প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (PTA) এবং কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (CEPA) নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যে শুল্ক সুবিধা বাড়তে পারে এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও গতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে PTA আলোচনা বর্তমানে কিছুটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে তৈরি পোশাক পণ্যের শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে আলোচনা এগোয়নি। ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের তৈরি পোশাক খাত একে অপরের প্রতিযোগী হলেও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যাগুলো সমাধান করা সম্ভব।
বাংলাদেশ শুধু পোশাক ও ওষুধ নয়, কৃষিপণ্য রপ্তানিতেও ইন্দোনেশিয়ার বাজারে সুযোগ তৈরি করতে চায়। বিশেষ করে আলু রপ্তানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান পরীক্ষাগার পরীক্ষা ও নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা দূর করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় আলু রপ্তানির চেষ্টা করলেও বিভিন্ন কারিগরি জটিলতার কারণে তা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
দুই দেশের মধ্যে হালাল পণ্যের বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। হালাল সার্টিফিকেশন ও মান নির্ধারণে পারস্পরিক স্বীকৃতি দেওয়া গেলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দেশের মধ্যে খাদ্য ও অন্যান্য হালাল পণ্যের বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে।
বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পেরতামিনার বাংলাদেশের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (SPM) টার্মিনাল পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে বাংলাদেশি ওষুধ শিল্পের প্রদর্শনী আয়োজনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হয়েছে। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী জাকার্তায় বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের একটি বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে। কারণ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি ইন্দোনেশিয়া। দেশটির বিশাল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশ করতে পারলে রপ্তানি খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু চুক্তি নয়, বাস্তব বাজার সুবিধা, পণ্যের মান, দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আমদানিনির্ভর বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা এবং ইন্দোনেশিয়ার বাজারে নিজেদের পণ্যের স্থায়ী অবস্থান তৈরি করা।
দুই দেশের মধ্যে চলমান আলোচনার মাধ্যমে যদি শুল্ক বাধা কমে, বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ে এবং রপ্তানি সুযোগ সম্প্রসারিত হয়, তাহলে বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।

