দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগে গতি এসেছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত সাত মাসে ৩২টি কূপের খননকাজ সম্পন্ন হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। তবে পাইপলাইন জটিলতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, সম্পন্ন হওয়া ৩২টি কূপের মধ্যে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ১৪টি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) ১১টি এবং বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) সাতটি কূপ রয়েছে। এসজিএফএলের কূপগুলোর মধ্যে আছে বিয়ানীবাজার-১ ও ২, কৈলাশটিলা-১, ২, ৭ ও ৮, রশিদপুর-২, ৩, ৫ ও ১১ এবং সিলেট-৭, ১০, ১১ ও ১০ এক্স। বাপেক্সের কূপগুলো হলো টবগি-১, শ্রীকাইল নর্থ-১, শরীয়তপুর-১, ভোলা নর্থ-২, ইলিশা-১, সুন্দলপুর-৩, বেগমগঞ্জ-৪ ওয়েস্ট, জামালপুর-১, শ্রীকাইল-৫, সেমুতাং-৬ ও রূপগঞ্জ-১। বিজিএফসিএলের কূপ তিতাস-১৪, ১৬, ২৪ ও ২৮, হবিগঞ্জ-৫, বাখরাবাদ-৭ এবং কামতা-২।
পেট্রোবাংলা জানায়, এসব কূপ থেকে দৈনিক ১৩৪ দশমিক ৪ এমএমসিএফ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা ধরা হয়েছিল। কিন্তু হবিগঞ্জ-৫ কূপে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গ্যাস মেলায় বর্তমানে ৩২টি কূপ থেকে প্রায় ১৪৭ দশমিক ৯ এমএমসিএফ গ্যাস গ্রিডে যাচ্ছে।
তবে সবটুকু সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। পেট্রোবাংলার রিজার্ভার অ্যান্ড ডাটা ম্যানেজমেন্ট বিভাগ জানায়, সম্পন্ন কূপগুলো থেকে আরও প্রায় ৬০ এমএমসিএফ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও পাইপলাইনসংক্রান্ত জটিলতায় তা নেওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সঞ্চালন অবকাঠামোর ঘাটতি সেই সক্ষমতার একটি অংশ আটকে রেখেছে।
নতুন কূপ খননও চলছে। ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরও সাতটি কূপের কাজ এখন চলমান। এগুলো হলো রশিদপুর-১৩, সুন্দলপুর-১ ও ৪, তিতাস-২৯ ও ৩১, ভোলা নর্থ এবং বাখরাবাদ-৬। পেট্রোবাংলার হিসাবে, জানুয়ারির মধ্যে এসব কূপের খনন শেষ হওয়ার কথা। কাজ শেষ হলে দৈনিক প্রায় ৯৬ এমএমসিএফ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে পাইপলাইন ও প্রসেসিং প্ল্যান্টের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে এর কতটা সরবরাহ করা যাবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সাজানো হয়েছে। ২০৩১ সালের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খননের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর ২০৩১-৩৫ মেয়াদে আরও ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পেট্রোবাংলা জানায়, বর্তমানে ১৯টি প্রকল্প চলমান। আরও নয়টি প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় আছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ৩১টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোবাংলার বোর্ডের মাধ্যমে আরও চারটি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিয়েছে সরকার। বঙ্গোপসাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছে মোট ২৬টি অফশোর ব্লক উন্মুক্ত করে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন কূপের সুনির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণে জরিপ চলছে। প্রকল্প নেওয়ার আগে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সম্ভাবনাময় স্থানে খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গ্যাস উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়। বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফ। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ এমএমসিএফ। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফ আসছে দেশীয় উৎস থেকে, আর ৯০০ থেকে ১ হাজার এমএমসিএফ আসছে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে।
দেশীয় উৎসের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো থেকে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৭০০ এমএমসিএফ গ্যাস গ্রিডে যাচ্ছে। নতুন কূপ যুক্ত হওয়ায় এই সরবরাহ আগের প্রায় ৫৬৬ এমএমসিএফ থেকে বেড়ে ৭০০ এমএমসিএফে উঠেছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো (আইওসি) থেকে দৈনিক প্রায় ৯০০ এমএমসিএফ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান বলেন, অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার নতুন কূপ খনন এবং বিদ্যমান কূপের ওয়ার্কওভার কার্যক্রমকে গুরুত্ব দিচ্ছে। ৩২টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে এবং সেগুলো থেকে গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। তবে পাইপলাইনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তিনি জানান, আরও সাতটি কূপের খনন চলছে। এগুলোর কাজ শেষ হলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ বাড়াতে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা ভবিষ্যতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি উদ্যোগ। তাঁর মতে, দ্রুত দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো যেমন দরকার, তেমনি নতুন গ্যাস যেন সময়মতো জাতীয় গ্রিডে পৌঁছায়, তাও নিশ্চিত করতে হবে। নতুন মজুত শনাক্ত হওয়ার পর অবকাঠামোর অভাবে গ্যাস যেন অব্যবহৃত পড়ে না থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, বর্তমানে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি প্রতিদিন ১ হাজার এমএমসিএফেরও বেশি।
সব মিলিয়ে চিত্রটি আশাব্যঞ্জক হলেও সতর্কতার দাবি রাখে। সাত মাসে ৩২টি কূপ সম্পন্ন করা এবং রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ১৩০ এমএমসিএফের বেশি বাড়ানো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। কিন্তু প্রায় ৬০ এমএমসিএফ গ্যাস পাইপলাইন জটিলতায় আটকে থাকা দেখাচ্ছে, শুধু কূপ খনন করলেই সংকট মিটবে না। যেখানে দৈনিক ঘাটতি এক হাজার এমএমসিএফের বেশি, সেখানে সঞ্চালন অবকাঠামো ও প্রসেসিং সক্ষমতা সময়মতো গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ কতটা দ্রুত কাটে, তার ওপরই নির্ভর করছে আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য কতটা বাস্তবে রূপ নেবে।

