বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের ধীরগতি, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং নানা জটিলতার পর এবার বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনায় আসছে নতুন ব্যবস্থা।
দুবাইভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৫ বছরের জন্য এই দায়িত্ব পাওয়ার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দরের সেবা ব্যবস্থায় গতি আনার আশা করছে সরকার।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বন্দরের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই হতাশাজনক। ২০২৫ সালের কনটেইনার বন্দর কার্যকারিতা সূচকে বিশ্বের ৪০০টি বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম।
এই অবস্থান শুধু আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য চ্যালেঞ্জ নয়, বরং দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। রপ্তানিকারকরা সময়মতো পণ্য পাঠাতে সমস্যায় পড়ছেন, অন্যদিকে আমদানিকারকদের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্য পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস করতে প্রায় আড়াই থেকে তিন দিন সময় লাগে। একইভাবে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাকগুলোকে অনেক সময় ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
এই পরিস্থিতিতে অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোর কার্যকারিতা বাড়িয়েই দ্রুত উন্নতি আনার সুযোগ তৈরি হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করতে পারে। একই সঙ্গে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালের বার্ষিক কনটেইনার পরিচালন সক্ষমতা ১২ লাখ টিইইউ থেকে বাড়িয়ে ১৮ লাখ টিইইউ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উন্নত যন্ত্রপাতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হবে। এর ফলে বন্দরের কার্যক্রম আরও দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় ট্রাকের অপেক্ষার সময় প্রথম বছরে কমে দুই ঘণ্টায় এবং পরবর্তী সময়ে এক ঘণ্টায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময়ও কমিয়ে এক থেকে দেড় দিনের মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, কনটেইনার বন্দরে পণ্য আটকে থাকার সময় এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। যদিও বাস্তবে এই সুফল নির্ভর করবে পরিচালন দক্ষতা, নীতির বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থার ওপর।
তবে শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। নতুন ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর তদারকি, নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ওপর।
ব্যবসায়ী মহলে ইতোমধ্যে নতুন ব্যবস্থায় সেবামূল্য বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, অতিরিক্ত খরচ তৈরি হলে বন্দরের গতি বাড়লেও তার সুফল অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই পরিচালন ব্যয় ও সেবামূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা জরুরি।
বিশেষ করে যেহেতু ব্যবসায়ীদের কাছে এই টার্মিনালের বিকল্প সীমিত, তাই ডিপি ওয়ার্ল্ড যেন বাজারে একতরফা প্রভাব ব্যবহার করে অযৌক্তিক চার্জ আরোপ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
স্বচ্ছতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে স্থানীয় অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই কনটেইনার পরিচালনার দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছিল। নতুন চুক্তিতে পরিষ্কার নিয়ম, জবাবদিহি এবং উন্মুক্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অনেকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখলেও বাস্তব বিষয় হলো, বন্দরের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকবে। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, চুক্তির শর্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নিতে পারে।
যদি নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী সেবা উন্নয়ন, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, বরং আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে। এই পরিবর্তন তাই শুধু একটি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন নয়, বরং দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।

