বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাপান। শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১১ অক্টোবর) সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জাপানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসাইউকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খানও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মারুবেনি করপোরেশন বাংলাদেশে তাদের বর্তমান কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশেষ করে সার উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প এবং জাপানের টয়োটা ব্র্যান্ডের গাড়ি নির্মাণসংক্রান্ত সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি, পাটশিল্পের আধুনিকায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্পের উন্নয়নে জাপানের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, কৃষিভিত্তিক শিল্প, জাহাজ নির্মাণ ও পুনর্ব্যবহার এবং উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর খাতে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের বড় সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্প নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে পাটকে শুধু প্রচলিত পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তুলা, ভিসকস ও পলিয়েস্টারের সঙ্গে পাটের আঁশ মিশিয়ে নতুন পণ্য তৈরি, উন্নত বীজ উদ্ভাবন এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ।
মারুবেনি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসাইউকি ওমোতো বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির আধুনিকায়ন, প্রাকৃতিক গ্যাসের কার্যকর ব্যবহার এবং সার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনেও নতুন বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে তাদের।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশের সম্ভাবনার প্রশংসা করেছে জাপানি প্রতিষ্ঠানটি। মারুবেনির সিইও বলেন, যৌথ বিনিয়োগে পরিচালিত বিজেআইটির মাধ্যমে শত শত বাংলাদেশি প্রকৌশলী জাপানসহ আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও বড় সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
বৈঠকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প উন্নয়ন, টয়োটা গাড়ি নির্মাণের সম্ভাবনা এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ক্ষুদ্র মডিউলার পারমাণবিক চুল্লি প্রযুক্তির সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কোম্পানি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স এবং অন্যান্য অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা ও মূলধন দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের মতো প্রযুক্তিনির্ভর দেশের বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্প কাঠামোকে আরও আধুনিক করতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কৃষিভিত্তিক শিল্পে জাপানি সহযোগিতা বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশের রপ্তানি সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
দুই দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা, প্রযুক্তি বিনিময় বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

