জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। সঙ্গে বেড়েছে ধানের দাম, আর মৌসুমের শেষ ভাগের প্রভাবও আছে। এসব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহে রাজধানী ঢাকাসহ কয়েকটি জেলায় চালের দাম বেড়েছে। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়ে আগে থেকেই হিমশিম খাওয়া ক্রেতাদের ওপর এতে চাপ আরও বাড়ল। তবে বাজারের এই চিত্রের সঙ্গে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যের মিল নেই।
গত রোববার রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এর দাম ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ছিল ৫৫ থেকে ৬২ টাকা, এখন তা ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত আছে, কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।
চালের দাম এমন সময়ে বাড়ল, যখন দীর্ঘদিন ধরেই দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ গত এক বছরে পণ্যের দাম গড়ে এই হারে বেড়েছে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা শামীম আল মামুন বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বারবার বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষ্য, এমন কোনো মাস যায় না, যখন কোনো না কোনো জিনিসের দাম বাড়ে না। এর মধ্যে চালের দাম বাড়লে চাপ আরও বাড়বে। চাল বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য, তাই এর দামের সামান্য বৃদ্ধিও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে।
বাজারের বাস্তব চিত্র ও সরকারি তথ্যের মধ্যে ফারাক চোখে পড়ছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে কোনো ধরনের চালেরই দাম বাড়েনি। বরং সরু চালের দাম কেজিপ্রতি ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। তবে গত এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবির তথ্যে দেখা গেছে।
টিসিবির বাজারতথ্য শাখার সহকারী পরিচালক শতদল মণ্ডল জানান, এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী তাঁদের হিসাব সঠিক বলেই মনে হচ্ছে। তবে বিষয়টি সামনে আসায় গরমিল খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও জানান, টিসিবির বাজার জরিপ শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, রামপুরা, মহাখালী ও পশ্চিম আগারগাঁও। তাঁর মতে, টিসিবির তথ্য একটি পণ্যের ক্ষেত্রে মিলেছে, বাকি দুটির ক্ষেত্রে মেলেনি। টিসিবির কর্মী ও সাংবাদিক, দুই পক্ষই বাজারে যান, তাই তথ্যে বড় ব্যবধান থাকার কথা নয়। তবু তাঁরা যাচাই করে দেখবেন।
সরকারি সংস্থার তথ্যে এই অসঙ্গতি নীতিনির্ধারণের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাজারদর নিয়ে সঠিক তথ্য না থাকলে ভোক্তাদের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ বলছেন। এক. জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি। দুই. ধানের দাম বৃদ্ধি।
সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা হয়। বিশ্ববাজারে দামের অস্থিরতা ও ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাওন জানান, সরু চালের পাইকারি দাম কেজিতে ১ টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা হয়েছে। মাঝারি মানের চালের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে হয়েছে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সা। মোটা চালের দাম বাড়েনি। বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬৫০ টাকায়, আর মাঝারি মানের চাল ১ হাজার ২১২ টাকায়।
শাওন বলেন, কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল আনতে আগে ভাড়া লাগত ২০ হাজার টাকা। জ্বালানির দাম বাড়ার পর এখন লাগছে ২৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ ট্রাকপ্রতি পরিবহন খরচ বেড়েছে ৪ হাজার টাকা, যা ২০ শতাংশ।
একই বাজারের আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী মামুনুর রশিদ বলেন, মৌসুম শেষ হয়ে আসাও দাম বাড়ার একটি কারণ। কয়েকটি জেলায় আমন ধান কাটা মাত্র শুরু হয়েছে। তবে তাঁর মতে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চালের দাম এখনো কিছুটা কম। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ সময়ে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় এবং মান অনুযায়ী সরু চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। কারওয়ান বাজারের পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুলও পরিবহন খরচ ও ধানের দাম বাড়াকেই দাম বাড়ার কারণ বলে উল্লেখ করেন।
ধান উৎপাদন ও চালের বাণিজ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কুষ্টিয়া ও নওগাঁর ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকেরাও দাম বাড়ার কথা জানিয়েছেন। তাঁরা কারণ হিসেবে ধানের দাম, পরিবহন খরচ ও মৌসুমি প্রভাবের কথা বলেছেন।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতির কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান জানান, গত এক মাসে মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা বেড়েছে। জাত অনুযায়ী সরু চাল এখন মিলগেটে ৫৫ থেকে ৬৭ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মিলগেট মূল্য হলো মিলমালিকেরা যে দামে প্রক্রিয়াজাত চাল পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। সরবরাহ ব্যবস্থার পরের ধাপে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হওয়ার আগের দাম এটি।
তিনি এই মূল্যবৃদ্ধির জন্য ডিজেল ও ধানের বাড়তি দামকে দায়ী করেন। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে ধানের দাম মণপ্রতি ১ হাজার ১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ২৪০ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ মণপ্রতি বেড়েছে ১২০ টাকা। তাঁর ভাষ্য, বছরের এ সময়ে ধান আরও ভালোভাবে শুকানো হয়। এতে আর্দ্রতা ও ওজন কমে যায়, ফলে কাঁচামালের খরচ বেড়ে যেতে পারে।
নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা জানান, গত পাঁচ দিনে সরু চালের পাইকারি দাম মণপ্রতি ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। স্থানীয় পাইকারি বাজারে এখন সরু চাল মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ২ হাজার ৫০ থেকে ২ হাজার ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাঁর মতে, মৌসুম শেষ হয়ে আসায় সম্প্রতি বিভিন্ন জাতের চালের দাম কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা বেড়েছে, যা বছরের এই সময়ে স্বাভাবিক।
সব মিলিয়ে চালের দামের এই বৃদ্ধি আপাতত সীমিত। সরু চালে কেজিতে ২ থেকে ৩ টাকা এবং মাঝারি চালে ৩ টাকার মতো বেড়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম এখনো কিছুটা কম। তবে সমস্যা হলো, দামের এই বৃদ্ধি এমন সময়ে আসছে, যখন মানুষের আয়ের তুলনায় খরচ আগে থেকেই বেড়ে চলেছে। জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু চালে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহননির্ভর অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে।
আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে মাত্র। নতুন ধান বাজারে পুরোপুরি এলে সরবরাহ বাড়বে এবং মৌসুমি চাপ কমতে পারে। তবে জ্বালানির বাড়তি দামের কারণে পরিবহন খরচ কমার সম্ভাবনা কম, ফলে দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে। বাজার তদারকি জোরদার করা এবং টিসিবির তথ্যসংগ্রহ পদ্ধতিকে ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত করা গেলে নীতিনির্ধারণে বাস্তবসম্মত তথ্য পাওয়া সহজ হবে বলে মনে হয়।

