চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কিছুটা বেড়েছে। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার, যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন সময়ে দেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১১১ কোটি ৩২ লাখ ডলার। তবে এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ৭৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার দেশে ফেরত নিয়ে গেছেন। ফলে প্রকৃত বা নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার।
এর আগের বছর ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন সময়ে দেশে মোট এফডিআই এসেছিল ১০৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৭৮ কোটি ৭১ লাখ ডলার প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা। ওই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোট বিনিয়োগ প্রবাহে খুব বড় পরিবর্তন না এলেও বিনিয়োগ প্রত্যাহারের পরিমাণ কমে যাওয়ার কারণে নিট বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রধান উৎস ছিল পুনর্বিনিয়োগ। নতুন বিনিয়োগ বা ইক্যুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ বরং কিছুটা কমেছে।
এপ্রিল-জুন সময়ে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ নতুন বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
অন্যদিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দেশে অর্জিত আয় পুনরায় ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে। এই তিন মাসে পুনর্বিনিয়োগ আয় থেকে এসেছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এই খাতে বিনিয়োগ এসেছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার।
এক বছরের ব্যবধানে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৫৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে নতুন বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশে আগে থেকে থাকা বিদেশি কোম্পানির মুনাফা পুনরায় বিনিয়োগের মাধ্যমে আসে। ফলে এফডিআই বৃদ্ধির পেছনে বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের আস্থাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে এই খাতে এসেছে মাত্র ৮৬ লাখ ডলার।
২০২৫ সালের একই সময়ে আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে এসেছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই খাতের বিনিয়োগ কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে দেশে নিট এফডিআই এসেছিল ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলার। এপ্রিল-জুন সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলারে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট এফডিআই এসেছিল ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। এর মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহ কমে আসছিল। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যবসায়িক পরিবেশসহ বিভিন্ন কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে চাপ তৈরি হয়েছিল।
তবে ২০২৫ সালে এ পরিস্থিতিতে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। ওই বছর দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে নিট এফডিআই এসেছে ১৭৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৪ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫০ কোটি ডলার।
তবে এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণের মাধ্যমে। নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু বিদ্যমান বিনিয়োগ ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়, নতুন বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
এর জন্য ব্যবসা পরিচালনার সহজতা বৃদ্ধি, নীতিগত স্থিতিশীলতা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনীতিতে শুধু অর্থ প্রবাহ বাড়ায় না, এর মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগও তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতে নতুন এফডিআই আকর্ষণ করা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

