বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইলেকট্রনিক নথিপত্র নিরাপদে আদান-প্রদান এবং কাগজের ঝামেলামুক্ত ডিজিটাল লেনদেনের বৈশ্বিক কাঠামো ‘ট্রেডট্রাস্ট’-এর প্রথম বাংলাদেশি পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রাম সফটওয়্যার অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড (এসএসসিএল)। সিঙ্গাপুরের ইনফোকম মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (আইএমডিএ) উদ্ভাবিত এই আন্তর্জাতিক ডিজিটাল ফ্রেমওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত সব প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, বৈশ্বিক ব্যাংক ও ডিজিটাল ট্রেড নেটওয়ার্কের তালিকায় নাম লেখালো দেশীয় এই সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানটি। এসএসসিএলের এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের ব্যাংক ও বড় বড় রপ্তানিমুখী শিল্পের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে এক নতুন দরজার উন্মোচন করল।
সাধারণ পাঠকের বোঝার সুবিধার্থে বলতে গেলে, ঐতিহ্যগতভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য পাঠানো বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলতে হলে শত শত পৃষ্ঠার কাগজের নথিপত্র এক দেশ থেকে অন্য দেশে ব্যাংক ও শিপিং এজেন্টের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। এতে যেমন প্রচুর সময় বা লিড টাইম অপচয় হয়, তেমনি কাগজ জালিয়াতির ঝুঁকিও থেকে যায়। ট্রেডট্রাস্ট বা ‘TradeTrust’ হলো এমন একটি নিরাপদ ডিজিটাল নেটওয়ার্ক যা ব্লকচেইন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক, কাস্টমস ও ব্যবসায়ীদের তৈরি ডিজিটাল বাণিজ্যিক নথিকে মুহূর্তেই যাচাই করার সুযোগ দেয়। অর্থাৎ কাগজপত্রের ফাইল কুরিয়ার না করে এক ক্লিকেই নথিগুলোর সত্যতা পরীক্ষা করে বিশ্বমানের বাণিজ্য কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়।
বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি মুহূর্তে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলারের মাধ্যমে অনুমোদিত বাণিজ্য করিডোরে ডকুমেন্টারি কালেকশন এবং এলসির অধীনে ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল বাণিজ্য নথি ব্যবহারের ওপর পাইলট প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো নথিপত্রের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করা, আইনি গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা এবং নথিপত্র পর্যালোচনায় মানবিক ভুল বা জালিয়াতি রোধ করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন উদ্যোগের আগে থেকেই স্পেকট্রাম দেশের অন্তত ১০টির বেশি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের সাথে ডিজিটাল ট্রেড অ্যান্ড প্রসেসিং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করে আসছিল, যা তাদের এই সম্মানজনক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের মতো পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য এই প্রযুক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত লাভজনক হতে পারে। কাগজবিহীন বা পেপারলেস আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হলে নথিপত্র যাচাইয়ের প্রশাসনিক ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। ব্যাংকিং প্রসেসিং সময় বাঁচায় আমাদের রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই শিপমেন্ট নিশ্চিত করতে পারবেন। বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার ট্র্যাকিং এবং গ্রিন এলসি বা পরিবেশবান্ধব বাণিজ্য অর্থায়নের ক্ষেত্রে স্পেকট্রামের উদ্ভাবিত অটোমেশন ও এআইভিত্তিক এনালিসিস টুলসগুলো দেশের আর্থিক খাতকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে দেবে।
ডিজিটাল বাণিজ্যের এই বৈশ্বিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দেশীয় ব্যাংক ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আস্থা বাড়াবে। স্পেকট্রামের হাত ধরে দেশে যদি সার্বিক বাণিজ্যিক লেনদেন কাগজমুক্ত করা সম্ভব হয়, তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক গতিশীলতা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে যা দেশের সার্বিক ব্যবসা করার খরচ কমিয়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়াতে সাহায্য করবে। দ্রুতগতির, নিরাপদ ও স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই বৈশ্বিক সুযোগ বাংলাদেশ কীভাবে গ্রহণ করে এবং বাস্তবায়িত করে, তা দেখতে এখন পুরো প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক খাত মুখিয়ে রয়েছে।

