বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ধীরে ধীরে বড় জায়গা করে নিচ্ছে তুলাভিত্তিক নয় এমন পোশাক। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে এ ধরনের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন বা ৯১৭ কোটি ডলার। একই সময়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ এসেছে নন-কটন বা তুলাবহির্ভূত পোশাক থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে কৃত্রিম তন্তু ও উচ্চমূল্যের পোশাকের চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে এই প্রবৃদ্ধিকে বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত তৈরি পোশাক রপ্তানির মোট আয় ছিল ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে তুলাভিত্তিক পোশাক থেকে এসেছে ২০ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির ৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে তুলাবহির্ভূত পোশাক থেকে এসেছে ৯ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার বা ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ।
তথ্যে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকেই নন-কটন পোশাকের অংশ ধীরে ধীরে বাড়ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এর অংশ ছিল ২৮ শতাংশ। জুনে তা বেড়ে ৩১ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছে প্রথমবারের মতো ৩০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করে। আগস্টে এর অংশ সর্বোচ্চ ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশে ওঠে। সেপ্টেম্বরে কিছুটা কমে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থের হিসাবে জুলাইয়ে নন-কটন পোশাক রপ্তানি সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে তুলাভিত্তিক পণ্য এখনো প্রধান ভিত্তি। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে তুলাভিত্তিক পোশাক রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৬০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ নন-কটন পোশাকের অংশ বাড়লেও তা তুলাভিত্তিক পোশাকের পতনের কারণে নয়; বরং এ ধরনের পণ্যের নিজস্ব রপ্তানি বৃদ্ধির ফলেই বাজারে অংশ বাড়ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মোহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে তুলা এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হলেও ভবিষ্যতের বাজার ধরতে নন-কটন পণ্যে আরও দ্রুত এগোতে হবে। তার মতে, বৈশ্বিক বাজারে মূল্যসংযোজিত ও কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাকের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতি এখনো যথেষ্ট নয়।
বিশ্বের পোশাকবাজারে পলিয়েস্টারসহ কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এসব উপকরণ দিয়ে বৈচিত্র্যময়, টেকসই, পুনর্ব্যবহারযোগ্য এবং বিশেষ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন পোশাক তৈরি করা যায়। খেলাধুলার পোশাক, শীতবস্ত্র, দ্রুত শুকায় এমন কাপড়, হালকা ও টেকসই পোশাকসহ বহু উচ্চমূল্যের পণ্যে কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার বেশি।
কিন্তু এই সম্ভাবনার বড় অংশ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। এর প্রধান কারণ স্থানীয় পশ্চাৎমুখী সংযোগশিল্পের দুর্বলতা। নন-কটন পোশাক তৈরিতে প্রয়োজনীয় কৃত্রিম তন্তু, সুতা ও কাপড়ের বড় অংশই এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, সরবরাহে সময় লাগে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যায়।
মোটেক্স ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মাসুদ কবির বলেন, বিশ্ববাজারে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের চাহিদা বাড়ছে মূলত বৈচিত্র্য, স্থায়িত্ব, পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা এবং তুলনামূলক ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়ার কারণে। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। স্থানীয়ভাবে তন্তু, সুতা ও কাপড় উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে এই বাজারের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নন-কটন পোশাক খাতকে এগিয়ে নিতে স্থানীয়ভাবে কৃত্রিম তন্তু ও কাপড় উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, দ্রুত কাঁচামাল পরিবহন, দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা এবং ব্যবসার খরচ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগীরা অনেক আগেই শক্তিশালী কাঁচামালভিত্তি তৈরি করেছে।
নন-কটন পোশাকের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পাঁচ দেশে রপ্তানি ছিল ৯৩৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
এই পাঁচ দেশেই বাংলাদেশের মোট অপ্রচলিত বাজারের পোশাক রপ্তানির ৫৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ গেছে। ওই তিন মাসে সব অপ্রচলিত বাজার মিলিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার।
অপ্রচলিত বাজারগুলোর মধ্যে জাপান এখনো সবচেয়ে বড়। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। মোট অপ্রচলিত বাজারের রপ্তানির ১৮ দশমিক ৯৭ শতাংশ গেছে জাপানে।
অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি ১ দশমিক ০২ শতাংশ বেড়ে ২০৯ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ভারতে রপ্তানি ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমে ২০৪ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। শীর্ষ পাঁচ অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে এই সময়ে রপ্তানি কমেছে।
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তুরস্কের বাজার থেকে। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি এক বছরের ব্যবধানে ৬৫ দশমিক ৭১ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৪৬ দশমিক ৬৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় রপ্তানিও ৮ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ১২০ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তুরস্ক একাই অতিরিক্ত ৮০ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় যোগ করেছে, যা এই পাঁচ বাজারে মোট বাড়তি রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ। তুরস্ককে বাদ দিলে বাকি চার বাজারে সম্মিলিত প্রবৃদ্ধি মাত্র ১ দশমিক ০৪ শতাংশ। ফলে অপ্রচলিত বাজারে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যে একটি নির্দিষ্ট বাজারনির্ভর, সেটিও স্পষ্ট।
বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে মোট ৩৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। একই সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি ছিল ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এখনো জাতীয় রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর।
এই বাস্তবতায় শুধু পোশাক রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো নয়, পণ্যের ধরন বদলানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তুলাভিত্তিক সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম তন্তু, কার্যক্ষমতাসম্পন্ন কাপড় ও উচ্চমূল্যের পোশাকের অংশ বাড়াতে পারলে প্রতি ইউনিট রপ্তানি থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ অংশীদারিত্ব যেমন ইতিবাচক সংকেত, তেমনি এটি একটি সতর্কবার্তাও। কারণ বাজার বাড়ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো দুর্বল। ফলে স্থানীয় পশ্চাৎমুখী সংযোগশিল্প শক্তিশালী না হলে নন-কটন পোশাকের বাড়তি চাহিদার বড় অংশ আমদানিনির্ভর উৎপাদনের মাধ্যমেই পূরণ করতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বিমুখী কাজ রয়েছে। একদিকে নতুন বাজার ও উচ্চমূল্যের পোশাকের দিকে এগোতে হবে, অন্যদিকে দেশে কৃত্রিম তন্তু, সুতা ও কাপড়ের শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। এই দুই ক্ষেত্র একসঙ্গে এগোতে পারলে নন-কটন পোশাক বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরবর্তী বড় প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

