উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে চলতি মৌসুমে সুপারি চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বিশাল কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া ও মাটি অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় এ বছর জেলা জুড়ে প্রায় ৭১০ কোটি টাকার সুপারি বেচাকেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। উত্তর তেহমনীসহ জেলার শতাধিক ছোট-বড় ঐতিহ্যবাহী হাটে এখন দিনরাত চলছে পাকা, শুকনা ও ভেজানো সুপারির রমরমা বাণিজ্য, যা চাঙ্গা করে তুলেছে স্থানীয় কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দিনমজুরদের জীবনযাত্রা।
কৃষি বিভাগের হিসেব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের প্রায় ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমির সুপারি বাগান থেকে প্রায় ৪২ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন সুপারি উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে জেলাজুড়ে মোট উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ বা অর্ধেকের বেশি সরবরাহ আসে রায়পুর উপজেলা থেকে, যার ঠিক পরপরই সদর উপজেলার অবস্থান। বর্তমানে বাজারে প্রতি কাউন (১,২৮০টি) পাকা সুপারি ২,৪০০ থেকে ২,৭০০ টাকায় এবং প্রতি পণ (৮০টি) ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় হাটগুলো থেকে এসব সুপারি কিনে ঢাকার আড়তসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি বাজারে সরবরাহ করছেন ব্যবসায়ীরা।
উৎপাদিত সুপারির প্রায় ৬০ শতাংশ সংরক্ষণ করা হয় নদী-নালা, খাল, ডোবা ও পুকুরের পানিতে ভিজিয়ে; যা স্থানীয় ভাষায় ‘ভিজি সুপারি’ নামে পরিচিত। বাকি ৪০ শতাংশ শুকিয়ে বা কাঁচা অবস্থায় বাজারজাত করা হয়। পানিতে ভিজিয়ে রাখা সুপারি কৃষকদের মৌসুম শেষ হওয়ার পর, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হয়। সুপারি চাষের বিশেষ সুবিধা হলো; একবার চারা রোপণ করলে উপযুক্ত পরিচর্যায় একটানা প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ফলন পাওয়া যায়। কম খরচে দীর্ঘমেয়াদে ধারাবাহিক আয় নিশ্চিত হওয়ায় প্রতি বছরই জেলায় নতুন নতুন জমির বাগান যুক্ত হচ্ছে।
কেবল বাগানমালিক বা ব্যবসায়ীরাই নন, এই মৌসুমকে কেন্দ্র করে আয় বেড়েছে গাছে উঠে সুপারি পাড়া মৌসুমি শ্রমিকদেরও। গাছ প্রতি ১০ টাকা হিসেবে দৈনিক আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন অভিজ্ঞ সুপারি সংগ্রাহক শ্রমিকরা। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ; এই দুই মাস সুপারি আহরণের প্রধান সময় হওয়ায় লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই সম্ভাবনাময় কৃষি খাতকে আরও বেশি লাভজনক করতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বালাই দমনে মাঠপর্যায়ে কৃষি পরামর্শ অব্যাহত রাখা হয়েছে।

