নতুন কোনো বড় বিদেশি কোম্পানি আসছে শুনলে আমাদের প্রথম কৌতূহল থাকে, কত মানুষের চাকরি হবে? প্রশ্নটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু গবেষণা বলছে, বিদেশি বিনিয়োগের আসল প্রধান ভালো দিকগুলো শুধুমাত্র কতজন চাকরির পেলো এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি বিদেশি কোম্পানি হয়তো একদিন ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে পারে, নিজের মুনাফাও বিদেশে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এ দেশের মানুষ যদি তাদের কাছ থেকে নতুন কাজ শেখে, দক্ষতা অর্জন করে এবং সেই জ্ঞান দিয়ে নিজেরাই ব্যবসা গড়ে তোলে, তাহলে সেই লাভের মূল্য সাধারণত টাকায় আমরা হিসাব করি না। তাই বিদেশি বিনিয়োগের লাভের হিসাব করতে হলে শুধু এটা দেখলে হবে না কত টাকা এসেছে বা কতজনের চাকরি হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোম্পানিটি চলে গেলেও দেশের হাতে কী কী থেকে যাবে।
১৩০ জন মানুষ, ছয় মাস, আর একটি শিল্পের গল্প
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের খুব দূরে যেতে হবে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের শুরুর দিকেই এর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলি। ১৯৭৮ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামের দেশ গার্মেন্টস দক্ষিণ কোরিয়ার দেওয়ু করপোরেশনের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি করে। সেই চুক্তির আওতায় প্রায় ১৩০ জন শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিতে কোরিয়ার পুসান শহরে যান। বিভিন্ন সূত্রে প্রশিক্ষণ নেওয়া মানুষের সংখ্যা ১২৮ থেকে ১৩০ জন বলা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে তাঁরা যে কারখানা গড়ে তোলেন, তাতে ছিল ছয়টি উৎপাদন লাইন ও ৬০০ শ্রমিকের কাজ করার ব্যবস্থা। কারখানাটির বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫০ লাখ পিস পোশাক। বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৩ লাখ ডলার। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। দেশ গার্মেন্টস ছিল বাংলাদেশের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। দেওয়ু এসে নিজে কারখানা খুলেছিল এমন নয়। তারা সহযোগিতা করেছিল, আর সেই সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জ্ঞান ও দক্ষতা।
এরপরই ঘটতে থাকে আরও বড় পরিবর্তন। গবেষকেরা দেখেছেন, প্রশিক্ষণ নেওয়া কর্মীদের অনেকেই পরে দেশ গার্মেন্টস ছেড়ে নিজেরা পোশাক কারখানা গড়ে তোলেন। তাঁরা নতুন কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন, যাঁদের কেউ কেউ আবার নিজেদের ব্যবসা শুরু করেন। এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠানে শেখা জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে। একটি কারখানার অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি শিল্পের ভিত্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
আজ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের আকার দেখলে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বোঝা যায়। ২০২৪ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৯.৩ বিলিয়ন ডলার। পোশাক ও হোম টেক্সটাইল মিলিয়ে দেশের মোট রপ্তানির ৮৩ শতাংশের কিছু বেশি এসেছে এই দুই খাত থেকে। অবশ্য এত বড় শিল্প গড়ে ওঠার পেছনে শুধু একবারের প্রশিক্ষণই কাজ করেনি। সময়ের সঙ্গে দক্ষতা অর্জন, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং বিদেশি বাজার সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে শেখারও ভূমিকা ছিল।
একটি কোম্পানি থেকে অন্য কোম্পানিতে জ্ঞান যেভাবে ছড়ায়
অর্থনীতিবিদেরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন স্পিলওভার। সহজ ভাষায়, একটি কোম্পানি যে জ্ঞান, প্রযুক্তি বা কাজের পদ্ধতি নিয়ে আসে, তার সুফল শুধু সেই কোম্পানির মধ্যেই আটকে থাকে না। অন্য প্রতিষ্ঠানও সেই জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়। এই সুবিধা সাধারণত কয়েকটি পথে ছড়ায়। কোনো বিদেশি কোম্পানি স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য কেনে, কর্মীরা সেখানে কাজ শিখে অন্য প্রতিষ্ঠানে যান, আবার প্রতিযোগীরাও তাদের কাজের পদ্ধতি দেখে নতুন কিছু শেখেন।
বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ বেয়াতা ইয়াভোরচিক লিথুয়ানিয়ার কারখানাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করা স্থানীয় সরবরাহকারীদের উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে। একে বলা হয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানি যেসব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ বা অন্যান্য উপকরণ কেনে, তাদের সঙ্গে যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়, তার মাধ্যমে দক্ষতা ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর গবেষণার প্রাথমিক সংস্করণে দেখা যায়, কোনো বিদেশি কোম্পানি যে শিল্পে পণ্য বিক্রি করে, সেই ক্রেতা শিল্পে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ১০ শতাংশ বাড়লে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরবরাহকারীদের উৎপাদনশীলতা প্রায় ০.৩৮ শতাংশ বাড়ে। সংখ্যাটি ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়। বিদেশি বিনিয়োগের সুফল সব সময় সরাসরি চাকরি বা উৎপাদনের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানও এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।
আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউতে প্রকাশিত তাঁর চূড়ান্ত গবেষণায় অবশ্য একই শিল্পের ভেতরে এমন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূল সুবিধাটি এসেছে সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়েও মোস্তফা ও ক্লেপারের গবেষণায় দেখা গেছে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ কর্মীদের চলে যাওয়ার মাধ্যমে কাজের জ্ঞান ছড়িয়েছে। তাঁদের গবেষণার বক্তব্য হলো, এই জ্ঞান ছড়িয়ে পড়া ছাড়া বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের বিকাশ অনেক কঠিন হতো।
১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ইয়ুং হুয়ি রি ১১টি দেশের রপ্তানি সাফল্য বিশ্লেষণ করে আরেকটি বিষয় তুলে ধরেছিলেন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিশ্ববাজারে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল একজন অনুঘটকের, যিনি দেশি বা বিদেশি হতে পারেন। অর্থাৎ শুধু টাকা বা কারখানা থাকলেই হয় না। এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও দরকার, যারা নতুন বাজারে প্রবেশের পথ দেখাতে পারে এবং অন্যদের শেখার সুযোগ তৈরি করে।
একটি কারখানা কীভাবে মেয়েদের পড়াশোনায় প্রভাব ফেলল
বিদেশি বিনিয়োগের প্রভাব শুধু ব্যবসা বা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কখনো কখনো এর পরিবর্তন দেখা যায় পরিবার, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনেও।
রাচেল হিথ ও মুশফিক মোবারকের গবেষণায় বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের এমন একটি প্রভাব উঠে এসেছে। তাঁরা পোশাক কারখানার কাছাকাছি থাকা গ্রামের মেয়েদের সঙ্গে দূরের গ্রামের মেয়েদের তুলনা করেছেন। পাশাপাশি কারখানা আসার আগের ও পরের পরিস্থিতিও বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, পোশাক কারখানার কাছাকাছি থাকা মেয়েদের বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বয়স তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
এর পেছনে একটি বাস্তব অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। পোশাক কারখানায় কাজ করতে হলে অন্তত কিছুটা পড়তে, লিখতে ও হিসাব করতে জানতে হয়। ফলে মেয়েদের শিক্ষার মূল্য পরিবারের কাছে বেড়ে যায়। বাবা-মা তাঁদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী হন। একই সঙ্গে ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারের ভাবনাও বদলায়।
গবেষণাটিতে আরও দেখা গেছে, মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহ তৈরির ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের উপস্থিতির প্রভাব সরকারের একটি বড় নগদ সহায়তা কর্মসূচির প্রভাবের চেয়েও বেশি ছিল। অর্থাৎ কারখানা শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করেনি, বরং মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পেছনে পরিবারের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করেছে। এটি বিদেশি বিনিয়োগের এমন একটি সুফল, যা শুধু রপ্তানি বা কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যানে পুরোপুরি বোঝা যায় না।
নতুন ব্যবসার ধরন তৈরির ক্ষেত্রেও বিদেশি বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯৭ সালে নরওয়ের টেলিনর ও গ্রামীণ টেলিকমের যৌথ উদ্যোগে গ্রামীণফোন যাত্রা শুরু করে। এর সঙ্গে চালু হয় ভিলেজ ফোন কর্মসূচি। এই ব্যবস্থায় গ্রামের নারী উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে মোবাইল ফোন কিনতেন এবং অন্যদের কাছে ফোন করার সুবিধা বিক্রি করতেন।
বিশ্বব্যাংকের একটি নোটে এই ব্যবসার কাঠামো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণফোনের কাছ থেকে এয়ারটাইম কিনে নারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে তা আবার বিক্রি করত। ফলে গ্রামের মানুষ নতুন যোগাযোগসেবা পেতেন, আর নারীদের জন্য তৈরি হতো আয়ের সুযোগ। বিদেশি প্রযুক্তি, দেশীয় উদ্যোগ ও স্থানীয় চাহিদা একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছিল নতুন একটি ব্যবসায়িক মডেল।
সব বিদেশি কোম্পানি কি দেশের জন্য লাভজনক?
বিদেশি বিনিয়োগের সুফল নিয়ে কথা বলার সময় একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। সব বিদেশি কোম্পানি এলেই যে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। গবেষণায় এর উল্টো চিত্রও পাওয়া গেছে।
১৯৯৯ সালে ব্রায়ান এইটকেন ও অ্যান হ্যারিসন ভেনেজুয়েলার কারখানাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, বিদেশি মালিকানাধীন কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও একই বাজারে থাকা দেশীয় কারখানাগুলোর উৎপাদনশীলতা বরং কমেছে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে নিট লাভ ছিল সামান্য।
এর কারণ বোঝা কঠিন নয়। একটি বিদেশি কোম্পানি যদি বেশি দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়ে এসে একই বাজারে ব্যবসা শুরু করে, তাহলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাজার হারালে উৎপাদন কমাতে পারে বা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে পারে। তখন বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে শেখার সুযোগও কমে যায়। অর্থাৎ বিদেশি কোম্পানির উপস্থিতি একদিকে নতুন জ্ঞান ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বলও করে দিতে পারে।
১৯৯৮ সালে বরেনস্টাইন, দে গ্রেগরিও ও লি ৬৯টি উন্নয়নশীল দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত তুলে ধরেন। তাঁদের গবেষণা অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগ প্রযুক্তি স্থানান্তরের একটি কার্যকর মাধ্যম এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এর সুফল বেশি পাওয়া যায় তখনই, যখন সংশ্লিষ্ট দেশে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি থাকে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো দক্ষতা না থাকলে বিনিয়োগ এলেও তার সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো যায় না।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডও তাদের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬-এ এ ধরনের সতর্কতা দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের অঙ্ক বড় হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে দেশে নতুন কারখানা তৈরি হবে, অবকাঠামো গড়ে উঠবে, চাকরি বাড়বে কিংবা প্রযুক্তি স্থানান্তর ঘটবে। বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি সেটি বাস্তবে দেশের উৎপাদনক্ষমতা ও দক্ষতা কতটা বাড়াচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগের হিসাব কী বলছে?
বাংলাদেশের পরিস্থিতিও একেবারে একরঙা নয়। আঙ্কটাডের ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর এই পরিমাণ ছিল ১.২৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। টানা দুই বছর কমার পর এই বৃদ্ধি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের শেষে দেশে জমা বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বা স্টক প্রায় ১৯.৬৩ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো এক বছরে কত বিনিয়োগ এসেছে, তা দিয়ে দেশের বিদেশি বিনিয়োগের সামগ্রিক অবস্থান বোঝা যায় না। স্টক হিসাবটি দেখায়, সময়ের সঙ্গে দেশে মোট কত বিদেশি বিনিয়োগ জমা হয়েছে।
তবে আঞ্চলিক তুলনা করলে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। আঙ্কটাডের হিসাবে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগের স্টক ছিল ১৮.২৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামের ছিল ২৪৯.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের তুলনায় ১৩ গুণেরও বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়লেও বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
আঙ্কটাড বাংলাদেশের করব্যবস্থার কিছু দুর্বলতার কথাও তুলে ধরেছে। করের নিয়ম জটিল, করপোরেট করের হার একাধিক এবং কর ছাড় দেওয়ার পর তার সুফল যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এসব সমস্যা বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। সব তথ্য একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার ইতিবাচক লক্ষণ রয়েছে, কিন্তু আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং সেই বিনিয়োগের সুফল দেশের ভেতরে ধরে রাখার জন্য অনেক কাজ বাকি।
পরের বড় বিদেশি বিনিয়োগটি বিচার করব কীভাবে?
এই গবেষণাগুলো পাশাপাশি রাখলে বিদেশি বিনিয়োগ মূল্যায়নের জন্য আমার কাছে তিনটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এগুলো কোনো একটি গবেষণার সরাসরি সিদ্ধান্ত নয়, বরং বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল থেকে পাওয়া আমার পর্যবেক্ষণ।
প্রথম প্রশ্ন, বিদেশি কোম্পানিটির সঙ্গে স্থানীয় সরবরাহকারীদের সত্যিকারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে কি না। ইয়াভোরচিকের গবেষণা বলছে, বিদেশি বিনিয়োগের বড় সুফল আসতে পারে এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। বিদেশি কোম্পানি যদি সব কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ ও সেবা বিদেশ থেকে নিয়ে আসে, তাহলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেখার সুযোগ সীমিত থাকবে। কিন্তু দেশীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পণ্য কিনলে এবং তাদের মান ও দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করলে বিনিয়োগের সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, নতুন প্রযুক্তি ও কাজের পদ্ধতি শেখার মতো দক্ষ জনশক্তি আমাদের আছে কি না। বরেনস্টাইন ও তাঁর সহগবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদেশি বিনিয়োগের সুফল পেতে স্থানীয় মানুষের সেই বিনিয়োগ কাজে লাগানোর সক্ষমতা থাকা জরুরি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নিয়েও গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু একবার প্রশিক্ষণ নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ব্যাখ্যা করতে পারে না। উচ্চশিক্ষিত উদ্যোক্তাদের এই শিল্পে প্রবেশ, উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কাজের ভাগ তৈরি এবং বিদেশি বাজার থেকে নিয়মিত নতুন জ্ঞান অর্জনও শিল্পটির বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
তৃতীয় প্রশ্ন, বিদেশি কোম্পানিটি নতুন বাজার তৈরি করছে, নাকি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গা দখল করছে। এইটকেন ও হ্যারিসনের গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, বিদেশি কোম্পানির উৎপাদনশীলতা বাড়লেই পুরো অর্থনীতি সমানভাবে উপকৃত হবে না। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পারে, তাহলে একদিকে প্রযুক্তি ও দক্ষতা ছড়ানোর সুযোগ কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসারও ক্ষতি হতে পারে।
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর ইতিবাচক হলে বিদেশি বিনিয়োগের লাভ চাকরির সংখ্যা ও বিনিয়োগের অঙ্ক ছাড়িয়ে আরও দূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে। তৈরি হতে পারে দক্ষ কর্মী, নতুন উদ্যোক্তা, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এবং নতুন শিল্প। আর সেই সংযোগগুলো তৈরি না হলে বিনিয়োগের বড় অঙ্কও দেশের অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে কম সুফল রেখে যেতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প আমাদের দেখিয়েছে, প্রায় ১৩০ জন মানুষের শেখা কীভাবে একটি শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু অতীতের সাফল্য উদ্যাপন নয়। বরং পরের বিদেশি বিনিয়োগ থেকে কীভাবে আরও বেশি দেশীয় দক্ষতা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা তৈরি করা যায়, সেটি বোঝা। এখন প্রশ্ন হলো, পরের ‘দেওয়ু মুহূর্ত’ কোন খাতে আসবে, আর সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?
রাকিবুল ইসলাম
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

