ধানমন্ডি বা লালবাগের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একটা বড় ডাবের দাম শুনে চমকে উঠেছেন? আপনি একা নন। আগস্টের শেষ দিকে রাজধানীর বাজারে ছোট ডাব ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা থেকে লাফিয়ে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় উঠেছিল, আর বড় ডাব ২১০ থেকে ২২০ টাকায়।
সেপ্টেম্বর পেরিয়ে অক্টোবরেও দাম নামেনি। সেপ্টেম্বরে ঢাকার ফুটপাত ও বাজারে আকার ভেদে ডাব বিক্রি হয়েছে ১৭০-২২০ টাকায়। গরমে ডাবের চাহিদা বাড়ে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অজুহাতেই কি ডাবের দাম এতটা চড়া, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও কিছু কারণ?
গরম তো আছে, কিন্তু আসল চাপটা আসছে কোথা থেকে?
বিক্রেতারা সাধারণত তিনটি কারণ বলেন: গরমে চাহিদা বেড়েছে,সময় জোগান কম, আর আড়ত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। কথাগুলো ভুল নয়, কিন্তু পুরো গল্পও নয়, কারণ বাজারে আরেকটি বড় চাপ কাজ করছে, সেটি ডেঙ্গু।
চিকিৎসকেরা ডেঙ্গু রোগীকে ওরস্যালাইন, জুস, ডাবের পানি ও স্যুপের মতো তরল খেতে বলেন, কারণ জ্বরে ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে তরল ও লবণ বেরিয়ে যায়।আগস্টের প্রথম ১৮ দিনেই দেশে ১০ হাজার ২৯১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা পুরো জুলাই মাসের ৯ হাজার ২০৬ জনের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়।
এরপর পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ হাজার ৩৫৬ জনে। অর্থাৎ ১৮ আগস্ট থেকে ৬ অক্টোবর—৫০ দিনে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬৪ হাজার ৭৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী।
একজন রোগীর পেছনে অন্তত একজন স্বজন ডাব কিনতে ছোটেন, আর তারা দরকষাকষির মেজাজে থাকেন না। অর্থনীতির ভাষায় একে বলে অস্থিতিস্থাপক চাহিদা, মানে দাম বাড়লেও কেনা কমে না।
যে ডাব বাগানে ৬০ টাকা, সেটাই ফুটপাতে ২০০ কেন?
এবার সবচেয়ে মজার হিসাবে আসি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, গাছমালিকের কাছ থেকে একটি ডাব সংগ্রহ হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। কারওয়ান বাজারের আড়তে সেটিই আকারভেদে পাইকারিতে বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়, আর খুচরা বিক্রেতারা বিক্রি করছেন প্রায় ২০০ টাকায়।ক্রেতার দেওয়া প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে বাগানের মালিকের হাতে পৌঁছায় মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।
এক বছর আগে লক্ষ্মীপুরের এক আড়তদার জানিয়েছিলেন, গাছ থেকে নামানো, জড়ো করা, ট্রাকে তোলা আর ঢাকার আড়ত পর্যন্ত আনতে ডাবপ্রতি খরচ পড়ে ১০ থেকে ১৪ টাকা, যার মধ্যে ট্রাকভাড়া মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা।
একই প্রতিবেদনে ঢাকার আড়তদারের লাভ ধরা হয়েছিল ২০ থেকে ৩০ টাকা, আর ভ্যানওয়ালার ১০ থেকে ২০ টাকা। এখনকার বাগানদরের সঙ্গে এসব খরচ ও লাভ যোগ করলে একটি ডাবের দাম মোটামুটি ১০৫ থেকে ১৪০ টাকায় দাঁড়ায়। অথচ খুচরায় আমরা দিচ্ছি ১৭০ থেকে ২২০ টাকা।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা বলেন, গ্রাম থেকে শহরের একজন ক্রেতার হাতে এক একটি ডাব পৌঁছাতে এর মধ্যে প্রায় ১২ বার হাতবদল হয়। প্রতিটি হাতেই থাকে লাভের হিসাব। আবার ডাবপ্রতি ২০-৩০ টাকা লাভ নেয় শহরের মধ্যস্বত্বভোগী কিংবা আড়তদার।
অবশ্য সেপ্টেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ভাড়াও বেড়েছে, কিন্তু যে খাতে ডাবপ্রতি খরচ ৪ থেকে ৫ টাকা, সেখানে ভাড়া কিছুটা বাড়লেও দামের এত বড় ব্যবধান ব্যাখ্যা হয় না। আরেকটি বিষয় খেয়াল করার মতো।
আবার,জাগো নিউজ২৪ এর এক প্রতিবেদনে বিক্রেতারা দাবি করেছেন, তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছেন এমন অভিযোগ ঠিক নয়। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা বাজারেও দাম বাড়াতে হচ্ছে।
হাসপাতালের গেটে আসলে কী ঘটছে?
হাসপাতালের সামনে দাম আরও চড়া, আর এ নিয়ে ক্ষোভও সবচেয়ে বেশি। রাজধানীর মুগদা, মতিঝিল ও খিলগাঁওসহ কয়েকটি এলাকার চিত্র আর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে,মহল্লার তুলনায় হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে একই আকারের ডাবের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি।
সেখানে এক ক্রেতা জানান, রোগীর জন্য একজোড়া ডাব কিনতে লেগেছে ৪০০ টাকা, এক মাস আগে একই আকারের দুটি পেয়েছিলেন ২৬০ টাকায়। কারণটা আবেগের নয়, বাজারের। যিনি রোগীর জন্য ডাব কিনছেন, তাঁর হাতে চারটা দোকান ঘুরে দাম মেলানোর সময় নেই।
বিক্রেতার সামনে প্রতিযোগিতাও কম, কারণ মুগদার মতো হাসপাতালের সামনে সারা বছর বসেন মাত্র তিন চারজন বিক্রেতা। ফলে যেখানে ক্রেতা বাধ্য আর বিক্রেতা অল্প, সেখানে দাম ওপরের দিকে ঝুঁকবেই। এটা নতুন কিছু নয়।
প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়,২০২৩ সালের আগস্টে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে অভিযানে দেখা গিয়েছিল, একটি ওষুধের দোকান ডাব বিক্রি করছিল ১৫০-২০০ টাকায় কৃত্তিম সংকট দেখিয়ে। অথচ তাদের কেনা দাম ছিল ৬০-৯০ টাকায়। ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা সেই দোকান ও আরেক বিক্রেতাকে জরিমানা করেন।
সিন্ডিকেট নাকি সুযোগের বাজার?
ক্রেতাদের মুখে বারবার একটা শব্দ শোনা যায়: সিন্ডিকেট। ২০২৩ সালেও অভিযোগ উঠেছিল, বিক্রেতারা ডেঙ্গুর সুযোগ বুঝে একজোট হয়ে দাম বাড়িয়েছেন। আবার,একেকজন বিক্রেতারা নিজেদের মতো অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। তারা পাইকারিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় কিনে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা করে বিক্রি করে।
এখানে অর্থনীতির একটি নীতি কাজে লাগে। একই এলাকায় সবার দাম কাছাকাছি হলেই বলা যায় না যে তারা বসে দাম ঠিক করেছে, কারণ সবার কেনা দাম আর বাজারের চাহিদা এক হলে দামও একই দিকে যায়। সিন্ডিকেট বা যোগসাজশ প্রমাণ করতে হলে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ অনুযায়ী তদন্ত লাগে। ডেঙ্গুর মৌসুম ততদিনে পার হয়ে যায়। সিন্ডিকেটের অভিযোগ তাই বাদও দেওয়া যায় না, আবার প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত করাও যায় না। যা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তা হলো সংকটের সময় চড়া দাম হাঁকার সুযোগ।
আইন কতটা পারে?
এখানে একটা অস্বস্তিকর সত্য আছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ মূলত নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়াকে অপরাধ ধরে, আর ডাবের সরকারি নির্ধারিত দাম নেই বলে শুধু চড়া দামের কারণে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
যা করা যায় তা হলো রসিদ, মূল্যতালিকা আর মজুত নিয়ে নজরদারি। আবার জরিমানাও অনেক সময় মুনাফার তুলনায় খুব ছোট। চাঁদপুরের উদাহরণে তিন বিক্রেতার মোট জরিমানা ২ হাজার ৫০০ টাকা, আর ডাবপ্রতি ৫০ থেকে ৮০ টাকা লাভ ধরলে ৩০ থেকে ৫০টি ডাব বিক্রিতেই সেই জরিমানা উঠে আসে।
আইন বদলের উদ্যোগ চলছে। ৩০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশোধনীর খসড়া প্রকাশ করেছে, যেখানে সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে অবৈধ মজুতের শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং বিক্রয় রশিদ না দিলে এক বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু,এটি এখনো আইন হয়নি।
গাছের গোড়ায় কি লুকিয়ে আছে আসল সমস্যা?
দামের গল্প শুধু আড়ত আর ফুটপাতে শেষ হয় না, শুরু হয় গাছ থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৬ ও ১৭ অর্থবছরে দেশে নারকেলের উৎপাদন ছিল ৬ লাখ ৮৮ হাজার টন, যা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে হয়েছে ৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৩১ টন।
অর্থাৎ,এই সময়ের ব্যবধানে নারকেলের উৎপাদন কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। এই সংখ্যায় ডাব আর ঝুনো নারকেল একসঙ্গে ধরা, ডাবের আলাদা কোনো হিসাব নেই, এটাও বড় তথ্যঘাটতি। গবেষকেরা কমার পেছনে নারকেলের মাকড়, সাদা মাছি ও কালো মাথার ক্যাটারপিলারের আক্রমণকে দায়ী করেন। আরেকটা প্রবণতা আছে। ডাবের দাম বেশি হওয়ায় চাষিরা নারকেল পাকার অপেক্ষা না করে ডাবই বিক্রি করে দিচ্ছেন। কয়েকজন চাষির ভাষ্য, ডাব বছরে ছয় থেকে সাতবার বিক্রি করা যায়, নারকেল মাত্র দুবার।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে লক্ষ্মীপুরের কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সেখানে বছরে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় কোটি শুকনো নারকেল পাওয়া যায়, অথচ প্রতি মাসেই বিক্রি হয় গড়ে প্রায় দেড় কোটি ডাব। জোগানেও সময়ের একটা ব্যবধান আছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গুটি থেকে ডাব হতে প্রায় ৯০ দিন লাগে, আর গ্রীষ্মের খরায় গাছে গুটি কম এলে কয়েক মাস পরে বাজারে ঘাটতি দেখা দেয়। আগস্টে এক খুচরা বিক্রেতা আশা করেছিলেন, আরও মাসখানেকের মধ্যে জোগান বাড়বে। কিন্তু অক্টোবরেও দাম ২০০ টাকার আশপাশে, কারণ এর মধ্যে ডেঙ্গু আরও বেড়েছে। এখানে বাজারের একটি মৌলিক নিয়ম কাজ করছে। গাছ লাগিয়ে ফল পেতে বছরের পর বছর লাগে, তাই চাহিদা হঠাৎ বাড়লে জোগান ততটা দ্রুত বাড়ানো যায় না, আর দাম লাফ দেয়।
দাম কমবে কবে, আর ততদিন কী করবেন?
ডাব কোনো বিলাসী পণ্য নয়, বিশেষ করে এটি অনেকের কাছে শরীরে পানির ঘাটতি পূরণের প্রয়োজনীয় পানীয় তাই এর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া উদ্বেগের বিষয়।
ডাবের দাম কবে নামবে, তার নিশ্চিত উত্তর কারও কাছে নেই। তবে বাজারের হিসাব বলছে, সবকিছু নির্ভর করছে দুটি জিনিসের ওপর: ডেঙ্গুর প্রকোপ কত দ্রুত কমে, আর বাগান থেকে কতটা ডাব রাজধানীতে পৌঁছায়।
ততদিন ক্রেতা হিসেবে আপনি কয়েকটি কাজ করতে পারেন। ডাবকে একমাত্র উপায় ভাববেন না, কারণ বিশেষজ্ঞদের মতে ডেঙ্গু রোগীকে ওরস্যালাইন, ফলের রস, ভাতের মাড় বা স্যুপও দেওয়া যায়, আর অতিরিক্ত ডাবের পানিতে কিডনির ওপর চাপ পড়তে পারে। বাড়তি দাম নিলে ভোক্তা অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ জানান।
শুধু ক্রেতার সচেতনতায় অবশ্য বাজার ঠিক হয় না। তিনটি কাজ আগে দরকার। ডাব আর নারকেলের উৎপাদন ও চাহিদার আলাদা হিসাব রাখা, বড় আড়তের দৈনিক দর প্রকাশ করা, আর হাসপাতাল এলাকায় মূল্যতালিকা ও রসিদের নিয়ম মানানো। ভোক্তা অধিকার আইনের খসড়ায় রসিদ না দিলে এক বছরের কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব আছে, সেটি আইন হলে নজরদারি শক্ত হবে। দীর্ঘমেয়াদে সমাধান গাছেই তাই পোকা দমন আর নতুন বাগান ছাড়া এই ঘাটতি মিটবে না।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

