দেশের টেলিকম খাতের শীর্ষ কোম্পানি গ্রামীণফোনের আয় ও মুনাফা এ বছর কিছুটা কমেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) কোম্পানিটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৭২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এটি ছিল ২ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা ৯২ কোটি টাকা বা ৪ শতাংশের কিছু বেশি কমেছে। তবে তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা আগের বছরের সমানই থেকেছে। এতে ধারণা করা যায়, বছরের শুরুর দিকের দুর্বল ব্যবসার প্রভাবই নয় মাসের হিসাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
সোমবার অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়। সভা শেষে কোম্পানির ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় কোম্পানিটির ব্যবসাও কিছুটা কমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রামীণফোন ব্যবসা করেছে ১১ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৯৪৮ কোটি টাকা। ফলে ব্যবসার পরিমাণ ১৯২ কোটি টাকা বা দেড় শতাংশের কিছু বেশি কমেছে। ব্যবসা কমার প্রভাব পড়েছে পরিচালন মুনাফাতেও। এই সময়ে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যা গত বছর ছিল ৪ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। এতে ১০৯ কোটি টাকা কমেছে।
পরিচালন মুনাফা থেকেই কর, ব্যাংকঋণ ও সুদের খরচ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়জনিত লাভ-লোকসান হিসাব করে চূড়ান্ত বা কর-পরবর্তী মুনাফা নির্ধারণ করা হয়। এই হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ঋণ ও সুদ বাবদ খরচ এ বছর বেড়েছে। প্রথম নয় মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৫০৬ কোটি টাকা, গত বছর একই সময়ে যা ছিল ৪৫৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে ৫৩ কোটি টাকা। একদিকে পরিচালন মুনাফা কমেছে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যয় বেড়েছে। দুইয়ে মিলে নিট মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করেছে।
এই চাপ অনুপাতের হিসাবেও দেখা যায়। গত বছর প্রথম নয় মাসে মোট ব্যবসার প্রায় ৩৬ শতাংশ ছিল পরিচালন মুনাফা। এবার তা নেমে এসেছে প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশে। নিট মুনাফার অনুপাতও ১৯ শতাংশের কাছাকাছি থেকে কমে প্রায় ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। পরিবর্তনটা খুব বড় নয়, তবে এটি বোঝায় যে ব্যবসা কমার পাশাপাশি কোম্পানির আয়ের দক্ষতাও সামান্য কমেছে।
করের ক্ষেত্রে চিত্রটি প্রায় অপরিবর্তিত। প্রথম নয় মাসে গ্রামীণফোন সরকারকে কর দিয়েছে ১ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। গত বছর একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ১ হাজার ৫১০ কোটি টাকা। ফলে কর বাবদ খরচ ৭ কোটি টাকা কমেছে।
নয় মাসের হিসাবের পাশাপাশি জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের আলাদা প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে কোম্পানিটি। এতে দেখা যায়, এই তিন মাসে ব্যবসা হয়েছে প্রায় ৪ হাজার ১৭ কোটি টাকার। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪ হাজার ১০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যবসা সামান্য বেড়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা হয়েছে ৭৫১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের সমান। এর মানে, প্রান্তিক ধরে দেখলে ব্যবসা ও মুনাফায় উল্লেখযোগ্য তারতম্য হয়নি।
প্রান্তিকের এই হিসাব মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, মুনাফা কমার পুরো ধাক্কাটি এসেছে বছরের প্রথম ছয় মাসে। নয় মাসের মুনাফা থেকে তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা বাদ দিলে প্রথমার্ধে মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। গত বছর এই সময়ে তা ছিল প্রায় ১ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা। একইভাবে প্রথম ছয় মাসে ব্যবসা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার, যা গত বছরের প্রায় ৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার চেয়ে কম। অর্থাৎ বছরের শুরুতে ব্যবসা দুর্বল ছিল, পরে তা স্থিতিশীল হয়েছে। তবে স্থিতিশীল হওয়া মানেই ঘুরে দাঁড়ানো নয়। তৃতীয় প্রান্তিকে মুনাফা বাড়েনি, শুধু আগের বছরের স্তরে ধরে রাখা গেছে। তাই বছর শেষে নয় মাসের ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া কোম্পানির জন্য সহজ হবে না।
আয় ও মুনাফা কমলেও কোম্পানির সম্পদমূল্য বেড়েছে। প্রথম নয় মাস শেষে গ্রামীণফোনের স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পদের বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ২২ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ১৯ হাজার ১৩২ কোটি টাকা। এতে বোঝা যায়, কোম্পানিটি আয় কমার মধ্যেও তার সম্পদভিত্তি বাড়িয়েছে। টেলিকম খাতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তি হালনাগাদে নিয়মিত বিনিয়োগ করতে হয়। সম্পদ বাড়ার পেছনে সেই বিনিয়োগের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এর কারণ আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়নি।
সব মিলিয়ে গ্রামীণফোনের নয় মাসের আর্থিক চিত্র মিশ্র। ব্যবসা ও মুনাফা সামান্য কমেছে, ঋণ ও সুদের ব্যয় বেড়েছে, আবার সম্পদমূল্য বেড়েছে। শেষ প্রান্তিকের স্থিতিশীল ফলাফল কিছুটা আশার জায়গা। তবে বছরের বাকি সময়ে ব্যবসা বাড়িয়ে ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে কোম্পানিটি মুনাফার পতন কতটা ঠেকাতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

