এক সময় মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের ভিড়ে সরগরম থাকা রাজধানীর কাকরাইলের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স এখন কার্যত বন্ধ। ক্রেতা কমতে কমতে বেচাবিক্রি এমন পর্যায়ে নেমেছিল যে দোকানমালিকেরা গত ১ অক্টোবর থেকে বিপণিবিতানটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে পুরো মার্কেটের মালিকানা বিক্রির সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। এ জন্য হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
সোমবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিপণিবিতানের মূল ফটকের শাটার নামানো। শাটারের ওপরে ঝুলছে একটি পিভিসি ব্যানার, যাতে লেখা ১ অক্টোবর থেকে শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ থাকবে। ফটক বন্ধ থাকলেও ভবনের দুই পাশের ছয়-সাতটি দোকান ও একটি এটিএম বুথ এখনো চালু আছে। দুটি ফুড কোর্টে তখন ক্রেতা ছিলেন চার-পাঁচজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ২০তলা ভবনের বেজমেন্ট ও চারটি তলা নিয়ে চালু হয় এই শপিং কমপ্লেক্স। ভবনের বাকি অংশে ছিল অ্যাপার্টমেন্ট। কর্ণফুলী গ্রুপের নির্মিত এই বিপণিবিতানের ১৯৮টি দোকানের মালিকানা কিনে নিয়েছিলেন ১২৫ জন ব্যবসায়ী। শুরুতে এখানে তৈরি পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, টেইলার্স ও জুয়েলারির দোকান ছিল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট। দোকানমালিক সমবায় সমিতির নেতারা জানান, ১৯৮টি দোকানের মধ্যে বন্ধ হওয়ার আগে চালু ছিল মাত্র ২৫টি। অর্থাৎ বিপণিবিতানটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হওয়ার আগেই বাস্তবে প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল।
কেন এই পরিণতি, সে প্রশ্নের উত্তরে সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকীবিল্লাহ ওসমানী জানান, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে বেচাবিক্রি ধীরে ধীরে কমছিল। তাঁর ভাষ্য, মূলত তিন-চারটি কারণে মার্কেটটি ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ে।
প্রথম কারণ যানজট। গত দশকে মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসড়ক নির্মাণের সময় এলাকায় তীব্র যানজট তৈরি হয়। এতে বিপণিবিতানে ক্রেতাসমাগম ব্যাপকভাবে কমে যায়। তখন বেশ কয়েকজন দোকানমালিক আশপাশের অন্যান্য মার্কেটে অস্থায়ীভাবে দোকান সরিয়ে নেন। উড়ালসড়কের কাজ শেষ হওয়ার পরও তাঁরা আর ফেরেননি। এতে একবার ক্রেতা ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষই হারিয়ে ফেলা মার্কেটটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
দ্বিতীয় আঘাত আসে করোনাভাইরাস মহামারির সময়। সে সময় শতাধিক দোকান বন্ধ হয়ে যায়, যেগুলো পরে আর খোলেনি। তৃতীয়ত, মার্কেটের কয়েকটি প্রসাধনীর দোকানে মানহীন পণ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠে, যা পুরো বিপণিবিতানের সুনামে ক্ষতি করে। একটি মার্কেটে ক্রেতার আস্থা একবার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই কিছু দোকানের কারণে পুরো মার্কেটকেই এর মূল্য দিতে হয়েছে বলে ধারণা করা যায়।
ওসমানী বলেন, মালিকানা বিক্রির জন্য হাসপাতাল, ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর আশা, শিগগিরই বিক্রির বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
মার্কেট বন্ধ হওয়ায় ভেতরের আংশিক চালু থাকা দোকানগুলোও অনিশ্চয়তায় আছে। রেমন্ডের বিক্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তা মো. মামুন জানান, মার্কেট বন্ধ হলেও তাঁদের দোকানের মালিক এখনো নোটিশ দেননি, নোটিশ পেলে চলে যেতে হবে। জ্ঞান বিচিত্রা কফিশপের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা ভালো চলছে না, তাই আগামী মাসে তাঁরাও দোকান ছেড়ে দেবেন। সুমি’স হটকেক বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমানের ভাষ্য, মালিকপক্ষ থেকে এখনো কিছু জানানো হয়নি, তাই থাকবেন নাকি ছাড়বেন, তা নিশ্চিত নন। তিনি আরও জানান, অনেক দিন ধরেই বিপণিবিতানটি ক্রেতাশূন্য ছিল।
বিপণিবিতানটি নির্মাণ করেছিল কর্ণফুলী গ্রুপ। প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, এই গ্রুপের মালিকানায় আছেন সাবেক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির এই পরিণতি রাজধানীর খুচরা ব্যবসার একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়। এক সময় অভিজাত বিপণিবিতান ছিল কেনাকাটার প্রধান ঠিকানা। এখন ক্রেতাদের পছন্দ ও কেনাকাটার ধরন বদলেছে, যানজট ও সহজ যাতায়াত ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে। এই বাস্তবতায় বিপণিবিতানের জায়গা হাসপাতাল, ব্যাংক বা করপোরেট অফিসের মতো ভিন্ন ব্যবহারে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। তবে ক্রেতা না থাকলেও এখানে বিনিয়োগ করা ১২৫ জন ব্যবসায়ীর সম্পদ এখন আটকে আছে। বিক্রির দর ও শর্ত কী হবে এবং চালু থাকা দোকানগুলোর ভবিষ্যৎ কী, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

