ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। এ পরিস্থিতিতে জাপানকে সম্ভাবনাময় বিকল্প বাজার হিসেবে দেখছেন দেশের রপ্তানিকারকেরা। তাঁদের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও জাপানি ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারলে দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাপানে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এ সময়ে দেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে জাপানের অংশ বেড়ে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের বাজারে রপ্তানি হয়েছে ৩৪৩ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক। এই পরিসংখ্যান বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক আমদানিকারক দেশ জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনাকে তুলে ধরছে।
অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জাপানের পোশাকবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো সীমিত। সেখানে ধারাবাহিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও নিশ্চিত হয়নি। বাজারটিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, জাপানের বড় আমদানি বাজার এবং বাংলাদেশের রপ্তানিতে দেশটির ক্রমবর্ধমান অংশ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে প্রচলিত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো প্রচলিত বাজারের বাইরে জাপান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বাজার হয়ে উঠতে পারে। জাপানের ক্রেতাদের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং পরিবর্তিত ফ্যাশন চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
জাপানে পোশাক রপ্তানিতে ওঠানামা
গত কয়েক বছরে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে উত্থান-পতন দেখা গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশটিতে ১১৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৫ দশমিক ৮ শতাংশ কমে ১০৯ কোটি ডলারে নেমে আসে।
পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি ৯ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১১৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার ৪ দশমিক ৩ শতাংশ কমে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ কোটি ডলার।
একই সময়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাতের মোট রপ্তানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ফলে মোট তৈরি পোশাক রপ্তানিতে জাপানের অংশ কমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমেছিল।
তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে জাপানের বাজারে রপ্তানির অংশ বেড়ে যাওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, এই প্রবণতা ধরে রাখতে পারলে জাপানে বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশাল আমদানি বাজার, বাংলাদেশের অংশ এখনো সীমিত
জাপানের পোশাক আমদানির পরিসংখ্যানও বাজারটির সম্ভাবনার পরিচয় দেয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত জাপান ২ হাজার ৪৯৬ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছিল।
পরবর্তী ১২ মাসে দেশটির পোশাক আমদানি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। এরপর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৩৯০ কোটি ডলারে পৌঁছায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২ হাজার ৪১৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টে জাপান ৪০৫ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে পারলে তৈরি পোশাকশিল্পের প্রবৃদ্ধি ও বাজারের বৈচিত্র্য—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি মনে করেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সম্ভাবনাটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে এ বিষয়ে আলোচনা হলে বাজার সম্প্রসারণের পথ আরও সুগম হতে পারে।
বাজার সম্প্রসারণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের উপস্থিতি থাকলেও দেশটির মোট আমদানির তুলনায় বাংলাদেশের অংশ এখনো কম। এক বছর রপ্তানি বাড়া এবং পরের বছর কমে যাওয়ার প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, শুধু বিদ্যমান ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন।
এ জন্য নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট করা, পণ্যের ধরন ও মানে বৈচিত্র্য আনা, জাপানি ভোক্তাদের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক তৈরি এবং বাজারভিত্তিক বিপণন কৌশল জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ এবং মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে ধারাবাহিক নীতিগত সহায়তা, নতুন ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

