চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবন ও পণ্য রাখার শেডের ছাদে ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট-পিক ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গ্রিনার পারপেচুয়াল ইনিশিয়েটিভস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে।
গত ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, গ্রিনার পারপেচুয়াল ইনিশিয়েটিভস লিমিটেড আগামী ২০ বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করবে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া বক্তব্যে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফাত হামিম জানান, প্রকল্পটি পরিচালন ব্যয়নির্ভর ব্যবস্থায় বাস্তবায়িত হবে। ফলে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের পুরো দায়িত্ব থাকবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির ওপর। অর্থায়ন, নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ—সবকিছুই করবে গ্রিনার পারপেচুয়াল ইনিশিয়েটিভস লিমিটেড। এতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব তহবিল থেকে প্রাথমিক মূলধন ব্যয় করতে হবে না।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সূত্র জানায়, সৌরবিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের মূল্য সরকারি নির্ধারিত সর্বোচ্চ সীমা ১০ টাকা ৫০ পয়সার মধ্যে রাখা হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দরে আংশিক সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৪২ মেগাওয়াট-পিক পর্যন্ত নেওয়া হবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ৭ থেকে ১৩ মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করে। এ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটির আর্থিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২০ বছরে বিদ্যুৎ ব্যয় বাবদ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। নিজস্ব স্থাপনায় উৎপাদিত সৌরবিদ্যুৎ নির্ধারিত দামে কেনার ফলে প্রচলিত বিদ্যুতের শুল্ক ও দামের ওঠানামার ঝুঁকিও কিছুটা কমবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ভবন ও পণ্য রাখার শেডের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এতে নতুন করে বড় জায়গা অধিগ্রহণের প্রয়োজন ছাড়াই নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি দিনের ব্যস্ত সময়ে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ কমতে পারে এবং শিল্প ও আবাসিক গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের ব্যবহার কমলে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসে সহায়তা পাওয়া যাবে। ফলে দেশের কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য এবং জলবায়ু-সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখতে পারে।
সৈয়দ রেফাত হামিম বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই বন্দরের অবকাঠামোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, পণ্য রাখার শেডের ছাদে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের জন্যও অনুসরণযোগ্য উদাহরণ হতে পারে। এতে বড় ধরনের প্রাথমিক সরকারি বিনিয়োগ ছাড়াই পরিবহন ও শিল্প অবকাঠামোকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার সুযোগ রয়েছে।
চুক্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং গ্রিনার পারপেচুয়াল ইনিশিয়েটিভস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নূর আলম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে স্বাক্ষর করেন।
প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের শেডগুলোতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ ব্যয় সাশ্রয়, জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব বন্দর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

