চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) দাবি, ট্যারিফ বা মাশুল বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে এই সাফল্য এসেছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, আয়ের বড় অংশ এসেছে মাশুল বৃদ্ধির কারণে। এতে আমদানি-রপ্তানির সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
নয় মাসে আয় বেড়েছে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা
চবকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে কনটেইনার ও খোলা পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য পরিবহন থেকে আয় হয়েছে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই আয় ছিল ৪ হাজার ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব বেড়েছে ১ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের পুরো বছরে বন্দরের আয় হয়েছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা। ফলে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় ৩১৪ কোটি টাকা বেশি আয় করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে, একই সময়ে বন্দরের রাজস্ব ব্যয়ও কিছুটা কমেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর সময়ে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় কমেছে ৩৫ কোটি টাকা বা ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
২০২৫ সালের পুরো বছরে বন্দরের রাজস্ব ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা।
ডিজিটাল কার্যক্রম ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের দাবি বন্দরের
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধিতে ট্যারিফের ভূমিকা থাকলেও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, মাঠপর্যায়ে কাগজবিহীন কার্যক্রম চালু, অনলাইন সেবার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, কেনাকাটা ও মেরামতের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যয় তদারকি করা হয়েছে।
একই ব্যয়ে আগের তুলনায় বেশি কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে চট্টগ্রাম বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম ব্যয় কমার পেছনে অন্য একটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, আগের বছরগুলোতে গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বড় ধরনের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতির কার্যকাল ১৫ থেকে ২০ বছর হওয়ায় চলতি বছরে নতুন করে বড় কেনাকাটার প্রয়োজন কমেছে। ফলে বন্দরের ব্যয়ও কমেছে।
মাশুল বৃদ্ধিতে আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়ছে
বন্দরের রাজস্ব আয় বাড়লেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ নিয়ে স্বস্তি নেই। তাঁদের অভিযোগ, বছরের শুরুতে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ার পর আমদানি ও রপ্তানির খরচ বেড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বছরে প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা মূল্যের পণ্যের শুল্কায়ন হয়। এর মধ্যে জাহাজভাড়া ও বিমার মতো ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বছরের শুরু থেকে ট্যারিফ অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো এবং তা কার্যকর করার কারণে বন্দরের আয় বেড়েছে। কিন্তু শুধু রাজস্ব আয় বৃদ্ধি দিয়ে বন্দরের সাফল্য বিচার করা উচিত নয়।
তাঁর মতে, বন্দর ব্যবহারকারীদের চাহিদা অনুযায়ী সেবার মান বাড়ানো, পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় কমানো এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় সহনীয় রাখাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বন্দরের সেবা দ্রুত ও কার্যকর হলে শিল্পকারখানার কাঁচামাল দ্রুত খালাস করা সম্ভব হবে। এতে উৎপাদন কার্যক্রমে গতি আসবে এবং ব্যবসার খরচ কমবে। বিপরীতে, শুধু মাশুল বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়।
বিদেশি অপারেটরের হাতে যাচ্ছে এনসিটির দায়িত্ব
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিচালনব্যবস্থা নিয়েও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, ছয় মাস পর নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে যাওয়ার কথা।
চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয় এই টার্মিনালের মাধ্যমে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের নথি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিতে কনটেইনারপ্রতি মোট আয়ের ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া এনসিটি ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।
সিসিটি দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস। এ প্রতিযোগিতায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও রয়েছে।
৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব
ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি ও সিসিটিকে একীভূত করে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস সিসিটি ও জিসিবিকে একসঙ্গে পরিচালনার পাশাপাশি প্রাথমিকভাবে ৬০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বছরে ১৮ লাখ একক কনটেইনার এবং ৫০ লাখ টন পণ্য ওঠানো-নামানোর সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হবে।
তবে কোন প্রতিষ্ঠান কোন টার্মিনালের দায়িত্ব পাবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানিয়েছেন, এনসিটির পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের জন্য ছয় মাসের রূপান্তরকাল নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সিসিটি ও জিসিবি আপাতত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সরাসরি পরিচালনায় থাকবে।
আয় নয়, সেবার মানই হওয়া উচিত সাফল্যের মাপকাঠি
চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে ইতিবাচক হলেও এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে বন্দর ব্যবহারকারীরা কতটা উন্নত সেবা পাচ্ছেন তার ওপর। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত মাশুল এবং পরিচালন ব্যয় ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানোর সময় কমানো, টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং আমদানি-রপ্তানির খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি।
বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছে প্রকৃত সাফল্য হবে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দ্রুত পণ্য খালাস হবে, ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে।

