দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর পায়রায় সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বিনিয়োগ করতে চায় চীনের চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ। এ লক্ষ্যে সরকারের কাছে বিনিয়োগের আগ্রহ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। রোববার (১ নভেম্বর) নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের সঙ্গে এক বৈঠকে এ প্রস্তাব তুলে ধরে চীনা প্রতিনিধি দল। পায়রা বন্দরের সম্প্রসারণের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় নতুন একটি উৎস যুক্ত হতে পারে।
রোববার সকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে চায়না এনার্জি ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের প্রতিনিধিরা প্রতিষ্ঠানটির জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। চীনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ খাতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে বলে প্রতিনিধি দল জানায়। বাংলাদেশেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের আগ্রহকে স্বাগত জানান। তিনি বলেন, পায়রা বন্দর ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। শুধু বন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, এর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে বলেও তিনি জানান।
আসলে একটি সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম সচল রাখতে বিদ্যুতের প্রয়োজন অনেক বেশি। জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল, পণ্য ওঠানামার যন্ত্রপাতি, গুদাম, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও আলোকসজ্জা সবকিছুর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। বন্দরের কার্যক্রম বাড়লে এসব খাতের বিদ্যুৎ চাহিদাও বাড়ে। ফলে নিজস্ব বা বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। সৌরবিদ্যুতের আরেকটি সুবিধা হলো, সূর্যের আলো ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়, ফলে জ্বালানি হিসেবে কয়লা বা গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। তবে রাতের বেলা ও মেঘলা আবহাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখতে গ্রিড, ব্যাটারি বা বিকল্প ব্যবস্থার পরিকল্পনাও প্রয়োজন।
পায়রা এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির সঙ্গে চীনের সিএমসির যৌথ উদ্যোগে গঠিত বাংলাদেশ চায়না রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি পায়রা ৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকার ১১৬ একর জমিতে এই প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর সম্ভাব্যতা যাচাইও সম্পন্ন হয়েছে। তবে এটি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান প্রস্তাবিত প্রকল্প নয়। দুটি উদ্যোগের অবস্থান ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আলাদা।
এ ছাড়া পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষও নিজেদের স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে বন্দরের কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন ও সাবস্টেশনের ছাদে গ্রিড সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের দরপত্র সংশোধনী প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ বন্দরের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সৌরশক্তি ব্যবহারের চিন্তা আগে থেকেই রয়েছে। নতুন চীনা প্রস্তাবটি সেই উদ্যোগের তুলনায় কী পরিসরের হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, চীনা প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা, মোট বিনিয়োগের পরিমাণ, প্রকল্পের জমি, অর্থায়নের ধরন কিংবা নির্মাণের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি। কোনো চুক্তি বা চূড়ান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের কথাও প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পায়রা বন্দর দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনা। তাই যেকোনো বিনিয়োগ ও উন্নয়ন কার্যক্রমে জাতীয় স্বার্থ, বন্দরের নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে। বৈঠকে পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এখন প্রকল্পটির বাস্তব সম্ভাবনা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, উৎপাদিত বিদ্যুৎ বন্দরের নিজস্ব কাজে ব্যবহৃত হবে নাকি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে, বিদ্যুতের দাম কত পড়বে এবং প্রকল্পের অর্থায়ন কীভাবে হবে, এসব বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জমির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব ও নিরাপত্তা যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশি বিনিয়োগ শুধু প্রকল্পের অর্থায়ন নয়, দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ কেনার খরচ এবং পরিচালনার দায়িত্বের সঙ্গেও যুক্ত।
পায়রা বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে শুধু বিনিয়োগের আগ্রহ নয়, প্রকল্পের ব্যয়, বিদ্যুতের দাম, উৎপাদনক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার হিসাবও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণ করবে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক লাভজনকতা।

