বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে হংকংয়ের সঙ্গে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে অপরাধসংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আইনি সহযোগিতার চুক্তির চূড়ান্ত খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
সোমবার (২ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশ ও হংকং অপরাধ তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় তথ্য, নথিপত্র ও প্রমাণ আদান-প্রদান করতে পারবে। বিশেষ করে বিদেশে পাচার করা অর্থ ও অবৈধ সম্পদের অবস্থান শনাক্ত এবং সেগুলো উদ্ধারে দুই পক্ষ আইনি সহযোগিতা নিতে পারবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, হংকংয়ের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল সরকারের কাছ থেকে ২০২৫ সালের ১৪ মে চুক্তির খসড়া পাওয়া যায়। দুই পক্ষের আলোচনা ও আইনি যাচাই-বাছাই শেষে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর হংকংয়ের বিচার বিভাগ চূড়ান্ত খসড়ায় সম্মতি দেয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমানে ভারতের ২০১০ সালে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে। হংকংয়ের সঙ্গে প্রস্তাবিত চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলে এ ধরনের চুক্তির সংখ্যা দাঁড়াবে তিনটিতে।
অর্থ ফেরাতে অগ্রাধিকার তালিকায় ১০ দেশ ও অঞ্চল
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকংকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার।
এসব দেশের সঙ্গে আইনি সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং আদালতের আদেশ কার্যকরে সহযোগিতা পেতে ২৩টি দেশের কাছে পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদন পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। আরও ২১টি দেশে এ ধরনের আবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল।
১৫ বছরে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্যের বরাতে গত ১ এপ্রিল সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। এ হিসাবে বছরে গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে চলে গেছে।
অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্তে সরকার ১১টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মামলা চিহ্নিত করেছে। এসব মামলার তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা যুক্ত রয়েছেন।
২০২৬ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত আদালতের আদেশে দেশের ভেতরে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বিদেশে একই প্রক্রিয়ায় জব্দ ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।
এ ছাড়া পাচার করা অর্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে মোট ১৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে।
হংকংয়ে সম্পদ জব্দের নির্দেশ আদালতের
এদিকে অর্থ পাচারের পৃথক একটি মামলায় নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, তাঁর ছেলে ওয়ালিদ ইবনে ইসলাম এবং মেয়ে আনিকা ইসলামের হংকংয়ে থাকা সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ সেপ্টেম্বর আদালত এ আদেশ দেন।
দুদকের অভিযোগ, ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে ওই অর্থ যুক্তরাজ্য, আইল অব ম্যান ও হংকংয়ে পাচার করা হয়।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, হংকংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান চায়না সুপ্রিম লিমিটেডের প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিক হিসেবে ওই তিনজনের নাম পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক এশিয়া ব্যাংকে একটি হিসাব রয়েছে।
অবৈধ অর্থ দিয়ে কেনা সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার আশঙ্কায় দুদক আদালতের কাছে সম্পদ জব্দ ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আবেদন করেছিল। তবে হংকংয়ে ঠিক কত টাকা পাচার করা হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।

