বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশের) মর্যাদা হারানোর পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। ২০২৯ সালের পর দেশের রপ্তানিকারকদের পণ্যের মূল্য কমিয়ে বাড়তি শুল্কের ৪০ শতাংশ নিজেদেরই বহন করতে হতে পারে। উত্তরণ-পরবর্তী রূপান্তরকাল শেষ হলে বাংলাদেশ ইইউতে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারাবে। তখন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর প্রায় ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ হতে পারে।
এ তথ্য রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি মূল্যে শুল্ক এবং বিনিময় হারের প্রভাব মূল্যায়ন: বাংলাদেশের জন্য এলডিসি উত্তরণের প্রভাব’ শীর্ষক। গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় র্যাপিডের গবেষণা পরিচালক ড. মো. দ্বীন ইসলাম প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন র্যাপিডের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ।
ড. মো. দ্বীন ইসলাম বলেন, “রপ্তানিকারকরা এখন সামান্য মুনাফায় ব্যবসা করছেন। নতুন শুল্কের বোঝা তাদের জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াবে। ইইউ যদি ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের শুল্ক-পূর্ববর্তী মূল্য প্রায় ৪ শতাংশ কমাতে হবে।”
প্রতিবেদনটি জোর দিয়ে সুপারিশ করেছে, জিএসপি প্লাস সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং প্রস্তাবিত নতুন জিএসপি বিধিনিষেধ থেকে সুরক্ষামূলক ধারা শিথিল করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. বদরুন্নেসা আহমেদ বলেন, “চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুল্কের চেয়ে অশুল্ক বাধা বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে কমপ্লায়েন্স শর্ত, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন কাঠামো, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার।” তিনি বলেন, “উদ্ভাবন, অটোমেশন ও পণ্যের বৈচিত্র্য নিশ্চিত করে কম দামের পণ্যের বদলে উচ্চ মূল্যের পণ্য উৎপাদনে কাঠামোগত রূপান্তর প্রয়োজন। জিএসপি প্লাস সুবিধার ওপর বেশি নির্ভরতা টেকসই রপ্তানি উন্নয়নের পথ খুলবে না।”
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিআইএফটিএ) গবেষণা ব্যবস্থাপক হারুনুর রশীদ বলেন, “জিএসপি প্লাস সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। ইইউতে রপ্তানির ক্ষেত্রে উৎস বিধির শর্ত মেনে পণ্য তৈরিতে কাঁচামাল আমদানি সুবিধা নিতে হবে। রপ্তানি খাতের জন্য শক্তিশালী পশ্চাৎসংযোগ শিল্প গড়ে তুলতেও গুরুত্ব দিতে হবে।”
বাংলাদেশ রিজিওনাল কানেকটিভিটি প্রজেক্টের (বিআরসিপি) বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ মুনির চৌধুরী বলেন, “অশুল্ক বাধার খরচ শুল্ক বাধার চেয়ে বেশি। চট্টগ্রাম বন্দরের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বন্দরের কারণে রপ্তানি প্রক্রিয়া স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় নেয়। এলডিসিসির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উত্তরণের পর সরাসরি নগদ সহায়তা বন্ধ হলেও প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষা ও গবেষণায় সহায়তা দেয়া সম্ভব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এ বি এম ওমর ফারুক বলেন, “রাষ্ট্রীয় সুশাসন ও শ্রমিক অধিকার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানোও জরুরি।”
ট্যারিফ কমিশনের যুগ্ম প্রধান মামুন-অর-রশিদ আসকারী বলেন, “এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব বিকল্প পথ খুঁজতে হবে। এর মধ্যে নিজস্ব ট্রেডমার্ক পণ্য উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইইউসহ বিভিন্ন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে সহায়ক হবে।”

