চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের গতি কমে গেছে। কারণ, লাইটার জাহাজের সংকট। বর্তমানে বন্দরের বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া চ্যানেলে অন্তত ৭০টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এই অতিরিক্ত অবস্থানের কারণে প্রতিদিন একটি জাহাজকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হচ্ছে। বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাঁধে চাপবে। রমজানকাল সামনে রেখে ভোগ্যপণ্য যথাসময়ে খালাস না হওয়ায় দাম বাড়ার শঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
লাইটার জাহাজ সংকটের কারণ খুঁজতে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) সংবাদকাগজের সঙ্গে কথা বলেছে। এটি গঠিত হয়েছে তিনটি সংগঠনের সমন্বয়ে—বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিভোয়া), কোস্টাল ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (কোয়াব) এবং ইনল্যান্ড ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব চিটাগাং (আইভোয়াক)।
তিন সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সিরিয়াল প্রথা না মানা এবং চট্টগ্রামে বরাদ্দকৃত ৯০০ লাইটার জাহাজ মোংলা ও দেশের অন্যান্য রুটে চলার কারণে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বছরে বন্দরের বহির্নোঙর থেকে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টন পণ্য পরিবহন হয়। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ পণ্য বাল্ক জাহাজ থেকে ছোট লাইটারেজ জাহাজে খালাস করে দেশের ৩৮টি নৌরুটে পাঠানো হয়। লাইটার জাহাজের ধারণক্ষমতা ১ হাজার থেকে ২ হাজার টন। বাকি ৩০ শতাংশ কনটেইনার পণ্য সরাসরি টাগবোটে আনা হয় বন্দরের জেটিতে।
লাইটার জাহাজ মালিকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ৫০ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি মাদার ভেসেল থেকে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস হয়। কিন্তু গত দুই মাস ধরে প্রতিটি মাদার ভেসেলে কেবল একটি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে বর্তমানে বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় আছে প্রায় ৭০টি মাদার ভেসেল। এর মধ্যে দুটি জাহাজে প্রায় ৩৫ হাজার টন ছোলা, চারটি জাহাজে প্রায় ৮০ হাজার টন সয়াবিন তেল, ৯টি জাহাজে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার টন গম এবং ৫টি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টন ভুট্টা রয়েছে। লাইটার জাহাজ মালিক ও শ্রমিকরা বলেন, সিরিয়াল প্রথা ঠিকঠাক মানা হচ্ছে না। অতি মুনাফার আশায় অনেক লাইটার জাহাজ মোংলা, পায়রা ও অন্যান্য রুটে চলে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দযোগ্য জাহাজ কমে যাওয়ায় খালাস ব্যাহত হচ্ছে।
লাইটার জাহাজ শেখ এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাহাঙ্গীর বলেন, ‘গত দুই মাস ধরে প্রতিটি মাদার ভেসেলে একটি করে লাইটার জাহাজ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত লাইটার না থাকায় এক সপ্তাহে খালাসযোগ্য জাহাজে সময় লাগছে প্রায় ১ মাস। ফলে অপেক্ষমাণ জাহাজের সারি বেড়ে গেছে। প্রতিদিন একটি জাহাজকে ১৬ লাখ টাকা ডেমারেজ দিতে হচ্ছে।’
বাংলাদেশ লাইটার শ্রমিক ইউনিয়নের সহসভাপতি মোহাম্মদ নবী আলম বলেন, ‘কুয়াশার কারণে লাইটার চলাচলে সমস্যা হচ্ছে এমন কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু সত্যি বিষয় হলো সিরিয়াল প্রথা মানা হচ্ছে না। তিনটি সংগঠনের সমন্বয় নেই। কেউ নিজের স্বার্থ নিয়ে জাহাজ চালাচ্ছে। এ কারণে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সমন্বয় বাড়ানো না হলে বিশৃঙ্খলা চলতেই থাকবে।’
বিসিভোয়া সহসভাপতি নাজমুল হোসাইন হামদু বলেন, ‘চট্টগ্রামসহ সারা দেশে অন্তত ১৫০০ লাইটার জাহাজে পণ্য রাখা হচ্ছে। এসব জাহাজে চিনি, ছোলা, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন পণ্য রয়েছে। যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। বন্দর কর্তৃপক্ষ জরিমানা করছে, কিন্তু আমদানিকারককেই জরিমানা করা উচিত। সিরিয়াল প্রথা ঠিক রাখার জন্য নৌ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, গেজেটও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।’
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘লাইটার সংকট দেখিয়ে খালাস ব্যাহত করার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলো অজুহাত। রোজা সামনে, পণ্য লাইটার জাহাজে গুদাম করে রাখছে। তারপর অল্প অল্প খালাস করে বেশি দামে বিক্রি করা হবে। সব পক্ষ আন্তরিকভাবে কাজ করলে বাজারে সংকট বা দাম বৃদ্ধি হবে না।’

