দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র আকার নিচ্ছে। এলপিজি সিলিন্ডার এখন প্রায় দ্বিগুণ দামে মিললেও সরবরাহ খুব সীমিত। সরকার বলছে, সংকট সাময়িক এবং মজুত পর্যাপ্ত আছে কিন্তু বেসরকারি কোম্পানিগুলো এলসি সংকটের কথা জানাচ্ছে। আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমছে। দাম বৃদ্ধির জন্য আবার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের দোষারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাসাবাড়ির লাইনের গ্যাসের অবস্থাও নাজুক।
দেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রাপ্তি কমে যাওয়ায় বাড়ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ব্যবহার। বিগত ১৫ বছরে দেশে এলপিজির বাজার ২৫ গুণ বেড়েছে। এলএনজি প্রায় পুরোটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং বেসরকারি খাতের হাতে। বাসাবাড়ি বা শিল্পে ব্যবহার হওয়া এলএনজিও এখন সম্পূর্ণ আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
বড় বড় শিল্প গ্রুপের বিনিয়োগ রয়েছে এলপিজি সেক্টরে। সম্প্রতি সিটি গ্রুপও যুক্ত হয়েছে এ খাতে। যদিও এলএনজি আমদানি সরকারিভাবে হয়, এলপিজির ৮৫ শতাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের হাতে বলা যায় পুরো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। মোট মিলিয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা রয়েছে বছরে ৩৩ লাখ টন এলপিজি বোতলিং করার। এতে বছরে ১২ কেজির ২৭ কোটি ৫০ লাখ সিলিন্ডার ফিলিং করা সম্ভব।
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। আর পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০ প্রতিষ্ঠানের কাছে এলপিজি আমদানি ও বটলিং করার অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে ২৩ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আমদানি টার্মিনাল রয়েছে। বাকি সাত প্রতিষ্ঠান এলসি বা এলএনজির মাধ্যমে সরবরাহ পেয়ে স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্টের মাধ্যমে এলপিজি বাজারজাত করে।
সক্ষমতার দিক থেকে শীর্ষে আছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড। তাদের দুটি প্ল্যান্টে বার্ষিক সাড়ে ৩ লাখ টন এলপিজি হ্যান্ডলিং ও বটলিং সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ৫০ হাজার টনের সক্ষমতার পদ্মা এলপিজি লিমিটেডের প্ল্যান্টও কিনে নিয়েছে জেএমআই।
দ্বিতীয় অবস্থানে বিএম এনার্জি, চারটি প্ল্যান্টে বছরে ৩ লাখ ১০ হাজার টন সক্ষমতা। পরের অবস্থানে আছে বসুন্ধরা ও ওমেরা পেট্রোলিয়াম, চারটি প্ল্যান্টে মোট তিন লাখ টন বটলিং সক্ষমতা। এস আলমের ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস লিমিটেডের প্ল্যান্টে বছরে দুই লাখ ৮০ হাজার টন সক্ষমতা রয়েছে।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান:
- মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড – আড়াই লাখ টন
- পেট্রোম্যাক্স লিমিটেড – দুই প্ল্যান্টে ১ লাখ ৬০ হাজার টন
- সান গ্যাস লিমিটেড – এক প্ল্যান্টে দেড় লাখ টন
- এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন – দুটি প্ল্যান্টে ১ লাখ টন
আরও ছোট ও মাঝারি প্ল্যান্টগুলো:
- ওরিয়ন এলপি গ্যাস – ৮০ হাজার টন
- বেক্সিমকো এলপিজি – ৩৬ হাজার টন
- দুবাই বাংলা এলপি গ্যাস – ৫০ হাজার টন
- ডেল্টা এলপিজি লিমিটেড – দুটি প্ল্যান্টে ৬০ হাজার টন
- বেঙ্গল এলপিজি লিমিটেড – ৩৬ হাজার টন, সম্প্রতি সিটি গ্রুপ কিনেছে
- ইউনাইটেড এলপিজি লিমিটেড (আইগ্যাস) – এক লাখ টন
- টিএমএসএস এলপিজি লিমিটেড – ৬০ হাজার টন
- প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস লিমিটেড – দুটি প্ল্যান্টে এক লাখ টন
- সেনা কল্যাণ সংস্থা – ৩০ হাজার টন
- নাভানা এলপিজি লিমিটেড – এক লাখ টন
- ইউরো পেট্রো প্রোডাক্ট – ৩০ হাজার টন
- প্রমিতা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস লিমিটেড – ৩৫ হাজার টন
- ইউনিভার্সাল গ্যাস – ৫৬ হাজার টন
এলপিজির প্রায় পুরোটাই প্রাইভেট সেক্টরের হাতে। নানান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে খাতটি এগোচ্ছে। তবে সরকারি নীতি সহায়তার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে এলসি জটিলতা, আমদানি ও বাজারজাতকরণে দুই ধাপে ভ্যাট এবং নতুন প্ল্যান্টে বিনিয়োগ ও ঋণ পাওয়ায় জটিলতা বিদ্যমান। – স্মার্ট গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান।
দেশে এলপিজি বাজার গত ১৫ বছরে ২৫ গুণ বেড়ে গেছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারিভাবে মোট ৬৯ হাজার ৫৭২ টন এলপিজি বাজারজাত হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) সরবরাহ করেছিল ২১ হাজার ১৬২ টন। বাকি এলপিজি আমদানি করেছিল তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
সবশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৬ হাজার ২শ টন এলপিজি আমদানি করেছে। একই সময় দেশি উৎস থেকে সরকারি এলপিজিএল ও তিনটি বেসরকারি রিফাইনারি ৪৫ হাজার ৬৩০ টন সরবরাহ করেছে। বটলিং না করা কিছু প্রতিষ্ঠানও এলপিজি আমদানি করে বটলারদের সরবরাহ করেছে। সবমিলিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট এলপিজি উৎপাদন ও আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টন।
শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানই আমদানি করেছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৩৫০ টন। আমদানিতে শীর্ষে ওমেরা। তারা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৩ টন এলপিজি আমদানি করেছে। দ্বিতীয় স্থানে মেঘনা ফ্রেশ – ২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৪১ টন। তৃতীয় স্থানে যমুনা স্পেসটেক – ২ লাখ ১৬ হাজার ৩০৯ টন। চতুর্থ স্থানে বিএম এনার্জি – ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫২০ টন। পাঁচ নম্বরে গ্রিন টাউন এলপি গ্যাস (বেঙ্গল এলপিজি) – ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৮ টন। ষষ্ঠ স্থানে পেট্রোম্যাক্স – ১ লাখ ১৯ হাজার ১৩৯ টন, সপ্তমে ডেল্টা এলপি গ্যাস – ৮৯ হাজার ১৬ টন। অষ্টমে জেএমআই – ৮২ হাজার ৬৪৬ টন। নবমে প্রিমিয়ার এলপি গ্যাস – ৬৭ হাজার ৪৩৪ টন। দশমে বসুন্ধরা এলপি গ্যাস – ৬৬ হাজার ৮৬৪ টন।
বিপিসির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে এলপিজি আমদানিতে শীর্ষে ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ। ২০২১-২২ এ তারা আমদানি করেছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫২ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কমে দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার ৭১২ টনে। ২০২৩-২৪ এ আরও কমে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ টনে। ২০২৪-২৫ এ তারা আমদানি করেছে মাত্র ৬৬ হাজার ৮৬৪ টন।
স্যাটেলাইট ফিলিং পয়েন্ট ব্যবহারকারী কোম্পানিগুলো:
- বিন হাবিব (বিডি) লিমিটেড – ৮ হাজার টন
- অর্কিড এনার্জি লিমিটেড – ১৫ হাজার টন
- পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট লিমিটেড – ১২ হাজার টন
- হাজি নাজির আহমেদ এলপি গ্যাস – ৬ হাজার টন
- এসএল কর্ণফুলী এলপি গ্যাস লিমিটেড – ৫০ হাজার টন (এক অংশ কিনেছে জেএমআই)
বাজারে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠান ও স্যাটেলাইট বটলিং কোম্পানিগুলো দেশের এলপিজি সরবরাহ ও মূল্যকে প্রভাবিত করছে। এলসি জটিলতা, আমদানি ও ভ্যাট নীতি, নতুন প্ল্যান্ট ও বিনিয়োগে ঋণ পাওয়ার সমস্যার কারণে বেসরকারি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে।
দেশে এলপিজি সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী, কিছু বড় কোম্পানির আমদানি কমে যাওয়ায় সরবরাহ সীমিত হচ্ছে। বেক্সিমকো এলপিজি লিমিটেড ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৩ হাজার ৫১৭ টন এলপিজি আমদানি করলেও ২০২৪-২৫ এ তা কমে ২৩ হাজার ২১৭ টনে নেমেছে। এস আলম গ্রুপের ইউনিটেক্স এলপি গ্যাস ২০২৩-২৪ এ ১ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৮ টন আমদানি করলেও ২০২৪-২৫ এ হয়েছে মাত্র ২০ হাজার ৭০০ টন। অন্যদিকে ওরিয়ন গ্রুপ ২০২৩-২৪ এ ৬ হাজার ১৯৬ টন এলপিজি আমদানির পর ২০২৪-২৫ এ কোনো এলপিজি আমদানি করেনি।
সরকার বিদ্যুৎ ও পাইপলাইনের গ্যাসে ভর্তুকি দিচ্ছে। কিন্তু এলপিজি সেক্টর কোনো ভর্তুকি ছাড়াই গড়ে উঠেছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, “এ খাতের প্রসার ও জনগণের কাছে সহজলভ্য করতে শক্ত নীতিমালা প্রয়োজন।” ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারি এলপিজিএল ২০ হাজার ৪৫০ টন এলপিজি বাজারে সরবরাহ করেছে। বিপিসি অনুমোদিত তিনটি বেসরকারি রিফাইনারি – সুপার পেট্রোকেমিক্যাল ১৯ হাজার ৬১১ টন, অ্যাকুয়া রিফাইনারি ২ হাজার ৮০ টন এবং পারটেক্স পেট্রো ৩ হাজার ৪৯০ টন সরবরাহ করেছে।
স্মার্ট গ্রুপের বিএম এনার্জি’র নির্বাহী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান বলেন, “প্রাইভেট খাতের মধ্যে এলপিজি একটি অগ্রসরমান খাত। তবে সরকারি নীতি সহায়তার অভাব, এলসি জটিলতা, দ্বৈত ভ্যাট, নতুন প্ল্যান্ট ও বিনিয়োগে ঋণ পাওয়ার জটিলতা খাতকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি এলপিজি আমদানি করতে চাইলেও অনুমোদন হয়নি। নীতি সহজ হলে বর্তমান সংকট এড়ানো যেত।”
তিনি আরও জানান, “যানবাহনের জন্য ভর্তুকিমূল্যের এলপিজি সিলিন্ডারে অবৈধভাবে ক্রসফিলিং হচ্ছে। এটি নতুন সংকট তৈরি করছে। সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এলসি জট কমানো এবং দ্বৈত ভ্যাট প্রত্যাহার করা গেলে সংকট সহজে কাটানো সম্ভব।”
ড. তামিম বলেন, “দেশে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমছে এবং পাইপলাইনের নতুন সংযোগ সীমিত। শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ না থাকায় এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বার্ষিক এলপিজি ব্যবহার ১৫ লাখ টনের ওপরে। এই হারে ব্যবহার বাড়লে ২০৩০ সালে চাহিদা ২৫ লাখ টনে পৌঁছাবে। আগামী পাঁচ বছরে চাহিদা আরও ১০ লাখ টন বাড়বে।” বর্তমানে দেশের মোট এলপিজি ব্যবহার: বাসাবাড়ি ৮০%, শিল্প ও বাণিজ্য ১২%, অটোগ্যাস ৮%।
ড. তামিম জোর দিয়েছেন, “সরকার বিদ্যুৎ ও পাইপলাইনের গ্যাসে ভর্তুকি দিয়ে এলপিজির চাহিদা বৃদ্ধি প্রতিহত করতে পারে। তবে প্রাইভেট খাতকে শক্তিশালী করতে স্পষ্ট নীতিমালা জরুরি।

