বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ আসে এই বাজার থেকে। তবে চলতি অর্থবছরে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–ডিসেম্বর) ইইউ বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৯ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
এই সময়ে নিটওয়্যার পণ্যের রপ্তানি ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলারে। আগের বছর একই সময়ে নিটওয়্যার থেকে আয় ছিল ৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। ওভেন পণ্যের রপ্তানিও কমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ওভেন রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর একই সময়ে আয় ছিল ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার। এতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
ইইউ বাজারে এ ধরনের নেতিবাচক প্রবণতায় রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এই অঞ্চল থেকে আসে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতির কারণে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামসহ বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো ইইউ বাজারে বেশি অংশ দখলের চেষ্টা করছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির চাপে চীন ও ভারত দ্রুত ইইউ বাজারে নিজেদের শেয়ার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে বাংলাদেশ ওই বাজারে অবস্থান হারাচ্ছে এবং রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং মজুরি বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যে প্রতিযোগী দেশগুলো বাড়তি প্রণোদনা দিয়ে নিজেদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আগের মতো নীতিগত সহায়তা ও নগদ প্রণোদনা এখন খুবই জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ইইউ বাজারে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রপ্তানি দুর্বলতা দেশের বাণিজ্য নীতি ও কৌশলগত প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতাকেই তুলে ধরে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে বাণিজ্য স্থানান্তর হয়েছে, বাংলাদেশ তা থেকে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি। ভিয়েতনাম, ভারত ও কিছু আফ্রিকান দেশ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ইইউ বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ধীরগতির নীতিগত সিদ্ধান্ত, সীমিত বাজার বৈচিত্র্য এবং তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে পিছিয়ে পড়েছে।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, মার্কিন বাজারে উচ্চ শুল্ক বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। একই সময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো কৌশলগতভাবে ইইউ বাজারে ঝুঁকেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও বাংলাদেশের রপ্তানি আশাব্যঞ্জক নয়। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি শুধু একটি বাজারকেন্দ্রিক নয়। এটি বহুমাত্রিক।
তার মতে, এই পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। প্রতিক্রিয়াশীল নীতির বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে যেতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানো, মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স উন্নয়ন এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা।
পাশাপাশি লজিস্টিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং ইইউসহ অন্যান্য বড় বাজারের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি আলোচনায় গতি আনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সময়োপযোগী ও সমন্বিত নীতি না নিলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ আরও বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে বলেও সতর্ক করেন এই অর্থনীতিবিদ।

