বর্তমানে আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ (ইআরসি) পেতে ব্যবসায়ীদের খাতভিত্তিক চেম্বার বা অ্যাসোসিয়েশনের বৈধ সদস্য সনদ দেখাতে হতো। এটি ছিল আমদানি-রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। শর্তটি নিশ্চিত করত উদ্যোক্তার সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব অংশগ্রহণ এবং বাণিজ্য সংগঠনগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা।
তবে সরকার ব্যবসা সহজ করার জন্য শর্তটি বাতিলের পথে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এতে বাণিজ্য সংগঠনগুলোর গুরুত্ব ও ক্ষমতা কমে যাবে। এরপর ‘আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইভেন্টের (নিবন্ধন) আদেশ, ২০২৩’-এর কিছু ধারা পরিবর্তন করে ‘আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও ইভেন্টের (নিবন্ধন) আদেশ, ২০২৫’ জারি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর ধারাবাহিকতায় আমদানি ও রপ্তানির প্রধান নিয়ন্ত্রক দপ্তরকে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন এখনও জারি হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের ৩০ ডিসেম্বরের চিঠিতে বলা হয়েছে, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির আইআরসি ও ইআরসির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন সনদ জমা দিতে হবে। বর্তমানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য পাসপোর্ট ও ওয়ার্ক পারমিট জমা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এছাড়া সেবা খাতের আইআরসি পেতে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সনদ বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। আগে এই সনদ মূলত পণ্য খালাসের সময় প্রয়োজন হতো।
বর্তমানে আইআরসি ও ইআরসি পেতে ব্যবসায়ীদের ট্রেড অর্গানাইজেশনের সদস্য সনদের পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক সলভেন্সি সনদ, টিআইএন, ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র, অংশীদারি ও কোম্পানি দলিল এবং নির্ধারিত ফি জমার রসিদ জমা দিতে হয়। সদস্য সনদের শর্ত তুলে দিলে এই যাচাই ধাপটি বাদ পড়বে।
আমদানি-রপ্তানিকারক ও শিল্প উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, শর্ত বাতিল হলে ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তাদের মতে, সদস্যপদ না থাকলে যে কেউ সহজে আইআরসি বা ইআরসি পেতে পারবে। এতে ভুয়া আমদানি-রপ্তানি, প্রতারণা ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি বাড়বে। পাশাপাশি বাণিজ্য সংগঠনগুলো সদস্য হারাবে এবং অনেক সংগঠন টিকে থাকাও কঠিন হবে। এর ফলে খাতভিত্তিক সমস্যা নিয়ে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করাও দুরূহ হবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদ বলেন, সদস্য হলে অন্তত নিশ্চিত হওয়া যায় উদ্যোক্তা সংশ্লিষ্ট খাতের প্রকৃত ব্যবসায়ী। শর্ত না থাকলে সঠিক আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক চিহ্নিত করা কঠিন হবে।
নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাণিজ্য সংগঠন শুধু সনদ দেয় না, তারা সদস্যদের সমস্যা সমাধান, সরকারের সঙ্গে আলোচনা এবং খাতের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। সদস্য না থাকলে অনেক সংগঠন বিলুপ্ত হবে। এতে ব্যবসায়ীরা কার্যত প্রতিনিধিশূন্য হয়ে পড়বেন।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সদস্যপদ শর্ত বাতিল করে আইআরসি ও ইআরসি সহজ হবে না। বরং যাচাই প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা, অনলাইনে আবেদন ও স্ক্রুটিনিং ব্যবস্থা চালু করা উচিত। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহযোগী সদস্যপদের মতো বিকল্প ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত সমাধান হতে পারে।

