দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রস্তাবিত আইনে প্রথমবারের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়া, বন্ধক রাখা সম্পদ বিক্রি করা এবং প্রয়োজনে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর্থিক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জনমত গ্রহণের জন্য ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের মূল লক্ষ্য হলো খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের জন্য একটি কার্যকর বাজার তৈরি করা, যাতে ব্যাংকগুলো দ্রুত সমস্যাগ্রস্ত ঋণ নিজেদের ব্যালান্স শিট থেকে সরিয়ে ফেলতে পারে এবং নতুন ঋণ বিতরণে সক্ষমতা ফিরে পায়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই হিসাবের মধ্যে খেলাপি ঋণ, অবলোপন করা ঋণ, পুনঃতফসিল করা কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ এবং আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এত বড় অঙ্কের অকার্যকর ঋণ দেশের বিনিয়োগ, ব্যাংকের তারল্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (ডিএএমইউ) নামে একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই সংস্থা বেসরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান, কার্যক্রম তদারকি এবং খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে। ইউনিটটির প্রধান সরকার নিয়োগ করবে এবং তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের উপ-গভর্নর সমমানের মর্যাদা পাবেন।
আইনে আরও প্রস্তাব করা হয়েছে, ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) নামে বিশেষায়িত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হবে। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে নগদ অর্থের বিনিময়ে খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কিনে নিতে পারবে। পরে তারা বিনিয়োগকারীদের অর্থ সংগ্রহ করে কিংবা বিশেষ ট্রাস্ট গঠন করে এসব সম্পদ পরিচালনা ও পুনরুদ্ধারের কাজ করবে।
খসড়া অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের অন্তত ২০ শতাংশ সদস্য স্বাধীন পরিচালক হতে হবে। তবে তারা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে পারবে না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ রাখা হয়েছে।
ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম আরও দক্ষ করতে ব্যাংক ও ডিএএমসিগুলো লোন সার্ভিসার কোম্পানি (এলএসসি) নামে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ, ঋণ পুনর্গঠন, সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং আইনি কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। তবে জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ বা জোরপূর্বক ঋণ আদায়ের মতো কোনো কর্মকাণ্ডে তারা জড়িত হতে পারবে না। এ বিষয়ে কঠোর আচরণবিধি প্রয়োগ করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
খসড়া আইনের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের অপেক্ষা না করেই বন্ধক রাখা সম্পদ দখল ও বিক্রির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখানে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধ করা হলে মালিকানা আবার আগের মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধানও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া অভ্যাসগত ঋণখেলাপি ব্যক্তি এবং তাদের সহযোগীরা এসব সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, ঋণ পুনরুদ্ধার সংস্থা কিংবা নিলামে বিক্রি হওয়া সম্পদ কেনার সুযোগ পাবেন না। এর মাধ্যমে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং খেলাপিদের প্রভাবমুক্ত একটি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনের বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক জরিমানা করা যাবে। লাইসেন্স ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালনা বা ভুয়া পরিচয়ে কার্যক্রম চালালে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। আর লাইসেন্স পেতে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় সংকট। ব্যাংকের মূলধন ক্ষয়, নতুন ঋণ বিতরণে সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার পেছনে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। তাই একটি কার্যকর সেকেন্ডারি মার্কেট তৈরি হলে ব্যাংকগুলো দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিক্রি করে মূল ব্যবসায় মনোযোগ দিতে পারবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, আদালতের বাইরে সম্পদ দখল বা কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে শক্তিশালী তদারকি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে অপব্যবহারের আশঙ্কাও থেকে যাবে। তাই আইন চূড়ান্ত করার আগে জনমত, ব্যবসায়ী মহল, ব্যাংকার, আইনবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ যদি এই আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের চাপ কমিয়ে ব্যাংকিং খাতকে আরও গতিশীল করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি শক্তিশালী ও টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথও সহজ হবে।

