রাতের নিস্তব্ধতায় একা দাঁড়িয়ে থাকে সে। চারপাশে কোলাহল নেই, ভিড় নেই, চেনা কোনো মুখ নেই। কেবল আছে অন্ধকার আর একরাশ ক্ষুধা। অথচ এই অন্ধকারই তার কাছে যেন দিনের চেয়ে বেশি আপন কারণ দিনের আলোয় তাকে ঘিরে দাঁড়ায় মানুষ, লাঠি হাতে, হুক হাতে, আর তার শরীরকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনের পরিকল্পনা হাতে।
একটি বন্দি হাতির জীবন এভাবেই চলে ভয় আর প্রয়োজনের দোলাচলে।
সম্প্রতি একটি হাতিকে ঘিরে যে ঘটনা আলোচনায় এসেছে, তা কেবল একটি প্রাণীর রাস্তায় নেমে আসার গল্প নয়। এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার এক করুণ দলিল যেখানে দায়িত্ব থেকে যায় কাগজে, আর বাস্তবতা থেকে যায় নির্মম।
প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার ফারাক
হাতিটিকে যখন হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, তখন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল নিরাপত্তার, যত্নের, সুস্থ জীবনের। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মাথায় অভিযোগ ওঠে সেই একই প্রাণীকে আবার রাস্তায় নামানো হয়েছে, মানুষের পকেট থেকে টাকা তোলার হাতিয়ার হিসেবে।
প্রশ্ন উঠতে বাধ্য দায়িত্ব নেওয়ার অর্থ কি কেবল একটি স্বাক্ষর? প্রাণীটির প্রকৃত মঙ্গল নিশ্চিত করার কোনো দায় কি থেকে যায় না?
একটি ক্ষুধার্ত প্রাণী যখন দোকানের সামনে খাবারের দিকে এগিয়ে যায়, তখন আমরা আতঙ্কিত হই, তাকে ‘উচ্ছৃঙ্খল’ আখ্যা দিই। কিন্তু কজন প্রশ্ন করি কেন সে ক্ষুধার্ত ছিল? তাকে কী খাওয়ানো হচ্ছিল? কীভাবে রাখা হচ্ছিল?
কথা বলতে না পারা এক জীবনের গল্প
এই প্রাণীটি নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে না। সে আদালতে গিয়ে বলতে পারে না, “আমাকে আর ওই নির্যাতনের কাছে ফিরিয়ে দেবেন না।” সে বন বিভাগের দরজায় গিয়ে বলতে পারে না, “আমার পেট খালি, আমার ভয় লাগছে।”
সে কেবল তাকিয়ে থাকে। অপেক্ষা করে। আর যখন ক্ষুধা ভয়কে ছাপিয়ে যায়, তখনই ঘটে যা ঘটার কথা নয়।
আমরা বলি হাতিটি বিশৃঙ্খলা করেছে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা এড়িয়ে যাই তাকে কি বাঁচার মতো একটা জীবন দেওয়া হয়েছিল?
জবাবদিহিতার প্রশ্ন
এই ঘটনা কেবল একজন মাহুত বা রক্ষকের গাফিলতির প্রশ্ন নয়। এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারিরও প্রশ্ন। শর্ত ভঙ্গ হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? নিয়মিত তদারকি কি আদৌ হয়েছিল? একটি বন্দি প্রাণীকে জীবিকার হাতিয়ার বানানো কতটা নৈতিক এই প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
কারণ প্রাণীটি নিজের অধিকারের জন্য লড়তে পারে না। সে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকতে পারে না, সামাজিক মাধ্যমে নিজের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরতে পারে না। তার হয়ে কথা বলার দায়িত্ব আমাদের, মানুষের।
একটুখানি মায়ার অপেক্ষায়
আজ রাতে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাণীটি হয়তো আমাদের কাছে খুব বেশি কিছু চায়নি। টাকা চায়নি, ক্ষমতা চায়নি। চেয়েছিল শুধু একটু খাবার, একটু নিরাপদ আশ্রয়, আর মানুষ যেন তাকে আর ভয় না দেখায় এটুকুই।
কিন্তু আমরা কি তা দিতে পেরেছি?
একটি প্রাণীকে নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে আবার সেই একই নিষ্ঠুরতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হলে, সেই ব্যর্থতা শুধু একজন মানুষের নয় এটি পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা। যতদিন না আমরা বন্দি প্রাণীদের প্রকৃত কল্যাণকে গুরুত্ব দিই, ততদিন এই চক্র চলতেই থাকবে নির্যাতন, ক্ষুধা, ভয়, আর তারপর আবার রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা টাকা তোলার আশায়।
এই প্রাণীর প্রয়োজন করুণার অভিনয় নয়। প্রয়োজন প্রকৃত পুনর্বাসন, পর্যাপ্ত খাদ্য, উপযুক্ত চিকিৎসা, আর নির্যাতনমুক্ত একটি জীবন।
কারণ তার অপরাধ একটাই সে ক্ষুধার্ত ছিল।
আর একটি ক্ষুধার্ত প্রাণীকে দোষারোপ করার আগে, নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত আমরা কি তাকে বেঁচে থাকার মতো একটা জীবন দিয়েছি?

