কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে এখন তৈরি হচ্ছে একটি পাকা সড়ক, যা নিয়ে স্থানীয় পরিবেশ কর্মী ও বন বিভাগের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ। শাপলাপুর এলাকার ওই বনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সরু মেঠো পথকে রূপান্তর করা হচ্ছে প্রায় ১৮ ফুট প্রশস্ত সড়কে, যার ফলে বনের অস্তিত্বই এখন বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথের কিছু কিছু অংশে ইতিমধ্যে কংক্রিটের ঢালাই দেওয়া হয়ে গেছে। রাস্তার দুই পাশে পাহাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকান ও পানের বরজ নিয়ে একটি পুরো জনবসতি, যাদের প্রত্যেককেই বন বিভাগের নথিতে অবৈধ দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা আছে। পথটি শেষ হয়েছে একটি পাহাড়ি ছড়ার কাছে, যেখানে নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ পাশে রেখে একাধিক শ্রমিক কাজ করছেন। নির্মাণকাজ তদারকিতে থাকা স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, এই সড়ক তৈরি হলে পাশের ইউনিয়নে যাতায়াত অনেক সহজ হয়ে যাবে, তাই তারা নির্মাণকাজে সহযোগিতা করছেন। আদালতের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই। এলাকাটিতে বসবাসকারীদের কাছে জমির কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই বলেও স্বীকার করেন তিনি।
বন বিভাগের রেকর্ড অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালে বন আইনের অধীনে শাপলাপুরের এই অংশকে সরকারিভাবে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়, যার আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ২৮৬ একর। এই বিপুল পরিমাণ বনভূমির ভেতরে বর্তমানে চার হাজারের বেশি মানুষ অবৈধভাবে বসতবাড়ি ও দোকান গড়ে তুলে বসবাস করছে। বন বিভাগের আশঙ্কা, এই সড়ক নির্মিত হলে দখলদারদের সুবিধা আরও বাড়বে এবং বনভূমি দখলের প্রবণতা আরও তীব্র হবে। এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে চলতি বছরের জুন মাসে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে একটি চিঠিও দিয়েছিল বন বিভাগ, যদিও ওই সংসদ সদস্য নিজেই সড়ক নির্মাণে বন বিভাগের সহযোগিতা চেয়ে আগে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
স্থানীয় একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলছেন, বনের ভেতর বসবাসকারীরাই মূলত এই সড়কের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে, আর তাতে বনের অবশিষ্ট অংশ রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়বে। স্থানীয় বন বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, প্রচলিত বন আইনে সংরক্ষিত বনের ভেতর কোনো ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। বন বিভাগ একাধিকবার বাধা দিলেও নির্মাণকারীরা জোর করেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, এমনকি এই ঘটনায় একটি মামলাও হয়েছে বলে তিনি জানান।
জাপানের একটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার অর্থায়নে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকৌশলী জানিয়েছেন, এই সড়কটি তাদের অনুমোদিত তালিকায় রয়েছে এবং এটি নির্মিত হলে পাশের ইউনিয়নের সঙ্গে দূরত্ব ২০ কিলোমিটার থেকে কমে সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কথা শুনেছেন বলে তিনি জানান, তবে এখনো সংশ্লিষ্ট নথি তাঁর হাতে পৌঁছায়নি। কতজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে এই সড়কের সুবিধা পাবেন, সে বিষয়েও সুস্পষ্ট কোনো তথ্য তিনি দিতে পারেননি।
এই সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে বন বিভাগের আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য প্রশাসনিক সহায়তা চেয়ে চিঠি দিলে বন বিভাগ জবাবে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সংরক্ষিত বনভূমি হওয়ায় বিদ্যমান আইনে এখানে কোনো সড়ক নির্মাণের সুযোগ নেই। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, এই বনে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, বিপন্ন প্রজাতির পাহাড়ি কচ্ছপ, মুখপোড়া হনুমান এবং অজগরসহ নানা প্রজাতির সরীসৃপ ও বন্যপ্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল রয়েছে। সড়ক নির্মিত হলে এই প্রাণীগুলোর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হবে এবং তাদের অস্তিত্বই সংকটে পড়বে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, একটি প্রাকৃতিক বন ও তার বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে বহু বছরের জটিল প্রক্রিয়ায়—যেখানে বন্যপ্রাণী, মাটির অণুজীব, কীটপতঙ্গ, উদ্ভিদ ও জলাধারের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। সড়ক নির্মিত হলে এই ভারসাম্য নষ্ট হবে, শতবর্ষী গাছ কাটা পড়বে এবং মানুষের মধ্যে বন দখলের প্রবণতা আরও বাড়বে।
আইনি দিক থেকে দেখলে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তরিত হয়, যার মধ্যে রয়েছে বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ–সম্পর্কিত একটি নতুন আইন। এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রাকৃতিক বন বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কোনো বনভূমির ক্ষেত্রে জাতীয় অপরিহার্য প্রয়োজনে বা কোনো বিকল্প না থাকলে নিরপেক্ষ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের শর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নিয়ে ব্যতিক্রম করার সুযোগ থাকলেও, সংরক্ষিত বনের ক্ষেত্রে এমন কোনো ছাড় নেই।
দেশের সংবিধানেও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জাতীয় বননীতিতেও উন্নয়ন প্রকল্পে বনভূমির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার কথা স্পষ্টভাবে বলা আছে।
এ প্রসঙ্গে একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একজন বলেন, মহেশখালী দেশের একমাত্র পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ দ্বীপ অঞ্চল, এবং বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এখানে সংরক্ষিত বনের ভেতরে সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। দেশে ইতিমধ্যে বনভূমির পরিমাণ কমতে থাকা অবস্থায় এই ধরনের সড়ক নির্মাণ ভবিষ্যতে বনভূমি উজাড়ের পথ আরও প্রশস্ত করবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
সবমিলিয়ে দেখা যায়, একদিকে স্থানীয় যাতায়াত সুবিধার যুক্তি, অন্যদিকে দেশের একমাত্র পাহাড়ি বনসমৃদ্ধ দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষার আইনি ও পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা—এই দুইয়ের মধ্যে স্পষ্ট সংঘাত তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক সংস্থাগুলোর ভিন্নমুখী সিদ্ধান্ত এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলা নির্মাণকাজ দেশের বন সংরক্ষণ আইনের বাস্তবায়ন কতটা দুর্বল, তা-ই যেন সামনে তুলে ধরছে।

