বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা কমছে, একই সঙ্গে বাড়ছে মানুষ ও হাতির সংঘাত। বন উজাড়, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, খাদ্যের সংকট, অবকাঠামো নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো নানা কারণে দেশের হাতির জন্য ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে দেশে আনুমানিক ২৬৮টি হাতি ছিল। এর মধ্যে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নয় বছরে মারা গেছে ১৪৬টি হাতি। ফলে দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও হাতির নিরাপদ বিচরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শনিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ের পর্যটন ভবনে ‘হাতি সংরক্ষণ: বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এসব বিষয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, মানুষ ও হাতির মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকার সমন্বিতভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেবে।
বন বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে সমস্যার গভীরতা কিছুটা স্পষ্ট হয়। ২০১৬ সালে দেশে হাতির আনুমানিক সংখ্যা ছিল ২৬৮টি। এরপর ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১৪৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে এতসংখ্যক হাতির মৃত্যু শুধু বন্যপ্রাণী হারানোর ঘটনা নয়, বরং হাতির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ আবাসস্থল ও চলাচলের পথ কতটা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, সেটিও সামনে নিয়ে আসে।
হাতির স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য বিস্তৃত বনাঞ্চল, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ চলাচলের পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষের বসতি সম্প্রসারণ, বন উজাড় এবং বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের কারণে হাতির পুরোনো আবাসস্থল ও চলাচলের পথ ধীরে ধীরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে খাবার ও পানির সন্ধানে হাতিরা অনেক সময় লোকালয়ের কাছাকাছি চলে আসছে। তখনই মানুষের সঙ্গে তাদের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়া, বন উজাড়, খাদ্যের ঘাটতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈদ্যুতিক ফাঁদের মতো বিষয় মানুষ ও হাতির সংঘাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। অর্থাৎ হাতির মৃত্যুর পেছনে শুধু একটি কারণ কাজ করছে না; বরং পরিবেশ ও মানুষের কর্মকাণ্ডের নানা পরিবর্তন একসঙ্গে এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বিশেষ করে হাতির চলাচলের স্বাভাবিক পথ বা বিচরণপথ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একটি হাতির পাল যে পথ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল করে, সেখানে যদি বসতি, সড়ক, স্থাপনা কিংবা অন্য কোনো বাধা তৈরি হয়, তাহলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয়। বাধ্য হয়ে তারা বিকল্প পথ খুঁজতে গিয়ে মানুষের বসতি বা কৃষিজমিতে ঢুকে পড়তে পারে। এতে একদিকে মানুষের ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, অন্যদিকে হাতিও বিপদের মুখে পড়ে।
এ ধরনের সংঘাত কমাতে সরকার হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংরক্ষণে আরও জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে কোন কোন এলাকায় মানুষ ও হাতির সংঘাতের আশঙ্কা বেশি, সেসব স্থান চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু এবং দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগাম সতর্কবার্তার ব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা গেলে হাতির চলাচলের বিষয়ে স্থানীয় মানুষ আগে থেকেই জানতে পারবেন। ফলে সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে। একইভাবে কোনো এলাকায় হাতি ঢুকে পড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা থাকলে মানুষ ও প্রাণী—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।
তবে হাতি সংরক্ষণের বিষয়টি শুধু বন বিভাগের একক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কঠিন হতে পারে। কারণ হাতির আবাসস্থল রক্ষা, বন সংরক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, বনাঞ্চলের আশপাশের জনগোষ্ঠী এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আলোচনায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, হাতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরাপদ আবাসস্থল ধরে রাখা। বনাঞ্চল কমে গেলে শুধু হাতি নয়, পুরো বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাতির মতো বড় প্রাণীর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও খাবারের প্রয়োজন বেশি হওয়ায় আবাসস্থলের সংকট তাদের ওপর দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও হাতির জীবনযাত্রায় নতুন চাপ তৈরি করছে। খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতায় পরিবর্তন এলে হাতির চলাচলের ধরনও বদলে যেতে পারে। এর সঙ্গে যদি বনাঞ্চল সংকুচিত হয় এবং পুরোনো চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে মানুষ ও হাতির মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে।
বৈদ্যুতিক ফাঁদও হাতির জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ফসল বা বসতি রক্ষার জন্য কোথাও অনিরাপদভাবে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হলে সেখানে হাতিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীও প্রাণ হারাতে পারে। ফলে সংঘাত কমাতে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থাগুলো চিহ্নিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশে হাতির সংখ্যা ও মৃত্যুর এই পরিসংখ্যান তাই শুধু একটি প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার হিসাব নয়। এর সঙ্গে দেশের বন, জীববৈচিত্র্য, মানুষের নিরাপত্তা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের বিষয়টিও জড়িয়ে আছে। নয় বছরে ১৪৬টি হাতির মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে যে হাতি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে আবাসস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষা, সংঘাতপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, আগাম সতর্কবার্তা চালু এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা উন্নত করার যে উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগই এখন গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা যত দ্রুত মাঠপর্যায়ে কার্যকর হবে, মানুষ ও হাতি উভয়ের জন্য নিরাপদ সহাবস্থানের সুযোগ তত বাড়বে।
আলোচনাটি যৌথভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি, আইইউসিএন বাংলাদেশ, ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স, আরণ্যক এবং ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন। বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণও দেখায় যে হাতি সংরক্ষণের বিষয়টি এখন শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষার একটি পৃথক কর্মসূচি নয়; বরং দেশের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই বিষয়টিকে দেখতে হচ্ছে।

