জাতিসংঘের সতর্কবার্তার মধ্যেই অতি শক্তিশালী হয়ে উঠছে এল নিনো। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, চলমান এল নিনো আগামী কয়েক মাসে আরও শক্তিশালী হয়ে ‘অতি শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এমনকি পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এটি সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এর প্রভাব ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
ডব্লিউএমওর ৩ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ইতোমধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি এবং তা আরও বাড়ছে। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এলাকা নিনো ৩.৪ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। সমুদ্রের নিচের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়েও ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি ছিল।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, ‘এল নিনো আমাদের চোখের সামনেই অস্বাভাবিকভাবে বড় আকার ধারণ করছে।’ তাঁর ভাষায়, পৃথিবী এখন এমন এক ‘অজানা পরিস্থিতির’ দিকে যাচ্ছে, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে।
|
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনো অন্তত ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, ২০২৬ সালের শেষ দিকে এটি সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছাতে পারে। এমনকি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পর্যবেক্ষণ শুরুর পর আগের রেকর্ডগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে এই এল নিনো।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবণতা, যা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরন, তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার কোথাও দেখা দিতে পারে অতিবৃষ্টি ও বন্যা।
তবে কোনো অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাব কতটা ভয়াবহ হবে, তা শুধু এর শক্তির ওপর নির্ভর করে না। অঞ্চল ও ঋতুভেদে এর প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের মতো অন্যান্য সমুদ্রীয় জলবায়ু প্রবণতাও এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাবকে আরও বাড়াতে, কমাতে কিংবা পরিবর্তন করতে পারে।
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাসে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর ২০২৬ সময়ে বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। একই সময়ে শক্তিশালী এল নিনোর কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এল নিনোর প্রভাব শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাবে কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদন, জীবিকা ও অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, দাবানল ও অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ একাধিক অঞ্চলে মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতির ওপর জোর দিচ্ছে ডব্লিউএমও। সংস্থাটি জানিয়েছে, জাতীয় আবহাওয়া ও জলবিদ্যা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে প্রস্তুত রাখতে কাজ করা হচ্ছে।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, এই অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনোর জন্য অস্বাভাবিক মাত্রার প্রস্তুতি প্রয়োজন। তাঁর মতে, দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা কাজে লাগিয়ে জীবন ও জীবিকা রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। সূত্র: বিবিসি

