নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে জানিয়েছে একটি নতুন গবেষণা। গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের ক্ষয়, বরফ গলে যাওয়া এবং আগে থেকেই থাকা ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতার সম্মিলিত প্রভাবে এই ভয়াবহ দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংযোগের (World Weather Attribution) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি কোনো একক কারণে সৃষ্টি হওয়া দুর্যোগ নয়; বরং একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
গবেষণার অন্যতম সহলেখক ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিদ ড. ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
গবেষণা প্রকাশের সময় নেপালের কর্তৃপক্ষ নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সংশোধন করে ৫ হাজার ১৭৯ জন থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ১৫০ জন করেছে। বুধবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস আঘাত হানে। এতে হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হন।
বিজ্ঞানীদের মতে, নেপালের হিমালয় অঞ্চলের লাংটাং লিরুং পর্বতের চূড়ার কাছে শিলাস্তর ও হিমবাহের বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।
ধসে পড়া পাথর ও বরফের বিশাল স্তূপ প্রচণ্ড শক্তিতে উপত্যকার নিচে আছড়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই আঘাত ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি করেছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি একমাত্র কারণ না হলেও এটি ছিল একটি ‘অস্থিতিশীলকারী উপাদান’, যা আগে থেকেই দুর্বল পাহাড়ি পরিবেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ওই অঞ্চলে জুলাই ও আগস্ট মাসের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।
একই সময়ে ওই এলাকার হিমবাহগুলো প্রতিবছর প্রায় আধা মিটার করে পাতলা হয়ে আসছিল। এর ফলে হিমবাহের ভেতরের ফাটল ও সংযোগস্থল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পাহাড়ি ঢালের স্থিতিশীলতা কমে যায়।
এ ছাড়া ২০১৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে হওয়া ভারী তুষারপাতের কারণে চলতি বছরের শুরুতে বিপুল পরিমাণ তুষার ও বরফ গলে পানি তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন একে অপরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে দুর্যোগের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে নেপালে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পও এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা বাড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে।
ওই ভূমিকম্পের কারণে এর আগে একটি শিলা ও বরফধসের ঘটনা ঘটেছিল। গবেষকদের ধারণা, সেই ভূমিকম্প পাহাড়ের অভ্যন্তরের শিলাস্তরকে দুর্বল করে থাকতে পারে।
উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বতাঞ্চলীয় জলবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ড. ওয়াল্টার ইমারজেল বলেন, এলাকাটি ছিল ‘ভূতাত্ত্বিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ একটি পাহাড়ি ঢাল’।
তার মতে, ২০১৫ সালের ভূমিকম্পের প্রভাবে ঢালটি দুর্বল হয়ে থাকতে পারে এবং পরে হিমবাহ ও চিরতুষারের পশ্চাদপসরণের কারণে সেটি আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংযোগের এই গবেষণা এখনো কোনো বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা বিশ্লেষণে তারা স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে।
এর আগে কয়েকজন বিশেষজ্ঞও হিমালয় অঞ্চলের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং বরফ-শিলা ধসের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কথা বলেছিলেন।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. সাইমন কুক বলেন, কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল হিসেবে চিহ্নিত করা কঠিন। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
তিনি বলেন, নতুন গবেষণাটি জলবায়ু পরিবর্তন যে এই দুর্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, তার কিছু শক্ত প্রমাণ দিচ্ছে। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এই ঘটনা ঘটেছে, তা পুরোপুরি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
দুর্যোগের পর নেপালের সরকার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
দেশটির দাবি, গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান বিশ্বের অন্যতম কম হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের কারণে দেশটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে তিনি সাম্প্রতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টি তুলে ধরবেন।
হিমালয়ের এই দুর্যোগ আবারও দেখিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বা তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিশ্বের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলগুলোতেও এটি নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

