জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭.৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীতে পরিণত হতে পারেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত এডিবির ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর আ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের ওপর প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি দেশে উপকূলীয় বন্যার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ আশপাশের উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় বেশি দরিদ্র। ফলে তাদের একই সঙ্গে বন্যার ঝুঁকি ও আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতে এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে স্পষ্ট। এসব দেশের যেসব পরিবার বন্যার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের দুর্যোগের প্রস্তুতি নেওয়া, ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া এবং পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদও তুলনামূলকভাবে কম।
এডিবির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য উপকূলীয় এলাকাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব অঞ্চল থেকে বছরে প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন হয়। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ায় উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ক্রমেই বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগের পরিমাণের তুলনায় সর্বোচ্চ ২০ গুণ পর্যন্ত সুফল পাওয়া যেতে পারে।
বাড়বে উপকূলীয় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে উপকূলীয় বন্যায় বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে বর্তমানের তুলনায় ছয় গুণেরও বেশি এবং ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় ২০ গুণ হতে পারে।
৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির হিসাবের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় বন্যায় বার্ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার। এটি ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বর্তমানের কাছাকাছি পর্যায়ে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি সীমিত রাখতে উপকূলীয় সুরক্ষাব্যবস্থায় বছরে আনুমানিক ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এডিবির হিসাবে, এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বছরে ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের বন্যাজনিত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
এডিবির জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি ঝুকভ বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উপকূলীয় এলাকাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এসব অঞ্চল পিছিয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকিভিত্তিক সমাধান গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এডিবির উপকূলীয় অঞ্চল রয়েছে এমন উন্নয়নশীল সদস্যদেশগুলোর ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ—অর্থাৎ প্রতি ১০ জনে একজনেরও বেশি—সমুদ্র উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করেন। এসব এলাকা বন্দর, বাণিজ্য, পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করে।
যথাযথ অভিযোজন ব্যবস্থা না থাকলে বড় অর্থনীতির দেশগুলো মোট আর্থিক ক্ষতির হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ছোট প্রবাল দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে অর্থনীতির তুলনায় ক্ষতির প্রভাব হতে পারে অনেক বেশি। উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে ২১০০ সালের মধ্যে এসব দ্বীপরাষ্ট্রে বার্ষিক বন্যাজনিত ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা ও মুম্বাইয়ের মতো বড় উপকূলীয় শহরগুলোতে অতীতে যে বন্যা গড়ে ১০০ বছরে একবার ঘটত, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা প্রতিবছরের ঘটনায় পরিণত হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয়েছে। এ ছাড়া, আঞ্চলিক বন্দরগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে প্রতিবছর ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ঝুঁকিতে রয়েছে।
জলবায়ু সহনশীলতায় বাড়াতে হবে বিনিয়োগ
উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা জোরদার করতে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও সুশাসন শক্তিশালী করা, অর্থায়ন বাড়ানো এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে এডিবি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য সমন্বয় করে পরিকল্পনা করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু ঝুঁকি ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নীতিমালা হালনাগাদের সুযোগ রাখতে হবে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় অর্থনীতিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়ন ২০১৫ সালের প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে বছরে গড়ে ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে অর্থায়নের বড় ঘাটতি এখনো রয়ে গেছে।
এডিবির মতে, উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর বিনিয়োগে সরকারি অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থের ঘাটতি পূরণ করতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি, বেসরকারি ও সহজ শর্তের অর্থায়ন আরও জোরদার করতে হবে।

