সরকার পাবলিক পরীক্ষায় অনিয়ম, বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে নকল ও প্রশ্নফাঁস রোধে বিদ্যমান আইনকে আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইন, ১৯৮০’ সংশোধনের প্রস্তাব ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত আইনে প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতিকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষায় অনিয়ম করলে শাস্তি আরও কঠোর করা হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ঘটালেও এই আইনের আওতায় বিচার করা হবে।
গত ২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। খসড়া আইনে মোট ১৯টি ধারা সংশোধন ও সংযোজনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যেখানে পরীক্ষাসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
ডিজিটাল জালিয়াতিতে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সাজা:
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষায় জালিয়াতির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে সংঘবদ্ধভাবে এই অপরাধে জড়িত থাকলে শাস্তি বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এসব মামলার বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে করার প্রস্তাবও রয়েছে। এ ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি পরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান যুক্ত করা হচ্ছে।
কোন অপরাধে কী শাস্তি:
খসড়া আইনে বিভিন্ন অপরাধের জন্য পৃথক শাস্তির প্রস্তাব রয়েছে। অন্যের হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিলে ২ বছর কারাদণ্ড, পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নফাঁস করলে ৪ বছর কারাদণ্ড, অ্যাডমিট কার্ড বা সনদ জাল করলে ৪ বছর কারাদণ্ড এবং উত্তরপত্র পরিবর্তন বা অতিরিক্ত পৃষ্ঠা সংযোজন করলে ২ বছরের সাজা হতে পারে।
এ ছাড়া নকল করতে সহায়তা করা, অননুমোদিতভাবে পরীক্ষা গ্রহণ বা খাতা মূল্যায়ন করাও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এসব ক্ষেত্রে ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। দায়িত্বে থেকে অনিয়ম করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা প্রস্তাব করা হয়েছে। পরীক্ষক যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর পরিবর্তন করেন, তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশোধিত খসড়ায় বলা হয়েছে, পরীক্ষাসংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্তদের বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা যাবে। এসব মামলার বিচার মেট্রোপলিটন বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার প্রস্তাব রয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষার হলে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। কেন্দ্র সচিব ছাড়া কেউ মোবাইল ফোন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবেন না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংসদে পাস হলে আগামী ২১ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেই নতুন আইনের বিধান কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ৩১ দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রশ্নপত্র ট্রেজারিতে নিরাপদ সংরক্ষণ ও পরিবহন, নির্ধারিত সময়ের আগে পরীক্ষার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, আসন বিন্যাস পুনর্বিন্যাস, পর্যাপ্ত কক্ষ পরিদর্শক নিয়োগ, টয়লেট তল্লাশি, সিসিটিভি নজরদারি এবং কেন্দ্রের বাইরে ভিড় নিয়ন্ত্রণ। এ ছাড়া ফলাফল চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে পুনঃনিরীক্ষণের পরিবর্তে খাতা পুনর্মূল্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে, যা পরীক্ষার্থীদের আরও ন্যায্য মূল্যায়ন নিশ্চিত করবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
কেন এই সংশোধন:
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, ১৯৮০ সালে প্রণীত এই আইন ১৯৯২ সালে আংশিক সংশোধন করা হলেও বর্তমান ডিজিটাল যুগের অপরাধের ধরন এতে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে প্রশ্নফাঁস ও নকলের ধরন বদলে গেছে, যা বিদ্যমান আইনে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে জিপিএ–৫ বাণিজ্য, প্রশ্নফাঁস এবং খাতা মূল্যায়নে অনিয়মসহ নানা ধরনের দুর্নীতি বেড়েছে। অন্যদিকে ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২০০টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৫টি, আর সাজা হয়েছে মাত্র একটি মামলায়।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, আইন কঠোর করাই যথেষ্ট নয়, এর সঠিক প্রয়োগও জরুরি। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আতিকুর রহমান বলেন, ডিজিটাল যুগে অপরাধের ধরন বদলেছে, তাই আইন আধুনিক করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নৈতিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, আগে কাগজে নকল হতো, এখন ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে জালিয়াতি হচ্ছে। তাই কঠোর আইন ছাড়া এই অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তিনি আরও জানান, পরীক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে খাতা মূল্যায়ন প্রক্রিয়াও আইনের আওতায় আনা হবে এবং এলোমেলোভাবে উত্তরপত্র পুনঃপরীক্ষা করা হবে।
প্রতি বছর প্রায় ৩০ লাখ শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় এই আইন সংশোধনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন, প্রযুক্তি ও নৈতিকতার সমন্বয় ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

