নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর গঠিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশে এখনো অনেক মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থক। তাদের সঙ্গে পুনর্মিলন বা রিকনসিলিয়েশন কীভাবে হবে?
জবাবে তিনি সংক্ষেপে বলেন, “আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের এক মাস না যেতেই আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ ধরনের মামলার ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এতে করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—তারেক রহমানের সেই বক্তব্য বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে। আইনের শাসনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা কার্যত কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।
সরকার অবশ্য যুক্তি দিচ্ছে, অতীত থেকে পাওয়া অবিচারের জট খুলতে সময় প্রয়োজন কিন্তু নতুন করে একই ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সমালোচকদের মতে, এর কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা নেই।
আইনের কাঠামো এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(এ) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ইতোমধ্যে অন্য মামলায় আটক থাকলে তাকে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটকে অবশ্যই মামলার ডায়েরি পর্যালোচনা করতে হয়। পাশাপাশি শুনানির সুযোগ দিয়ে ‘যৌক্তিক কারণ’ সন্তোষজনক মনে হলে তবেই অনুমোদন দেওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি এই বিধান যুক্ত করে উদ্দেশ্য জানিয়েছিল যে ‘শোন অ্যারেস্ট’ যেন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। কিন্তু বাস্তবে এই বিধানের প্রয়োগ খুব সীমিত বলেই অভিযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জামিনের পরও নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটকে রাখার প্রবণতা দেখা যায়, যা জামিনের কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এই পরিস্থিতি বোঝাতে ১১ মার্চের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ওইদিন হাইকোর্ট সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে একাধিক মামলায় চূড়ান্ত জামিন দেন কিন্তু এরপরও তার মুক্তি আটকে যায়। কারণ পুলিশ তাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। অথচ ওই মামলার এফআইআর-এ তার নাম ছিল না। বিষয়টি অনেকের কাছেই মনগড়া অভিযোগ বলে প্রতীয়মান হয়।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—একজন স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা বা থানার ওসি কি এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন? সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ছাড়া হাইপ্রোফাইল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ধারণা করা হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায় থেকেই এ ধরনের নির্দেশ আসতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত প্রশাসনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ গ্রেপ্তার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সাধারণত ঊর্ধ্বতন নির্দেশনার বাইরে হয় না। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলায় পুলিশ অনেক সময় নির্বাহী বিভাগের ইঙ্গিত বা নির্দেশনা অনুসরণ করে থাকে।
এ প্রেক্ষাপটে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। তিনি নিজেও একসময় বেআইনি আটক ও গুমের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। তাহলে তার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কি একই ধরনের ঘটনা চলতে দেওয়া হবে?
সরকার যদি সত্যিই আইনের শাসনের ভিত্তিতে বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে প্রমাণ করতে হবে যে ফৌজদারি প্রক্রিয়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে না। কিন্তু পুলিশি উদ্যোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীরবতা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বলেই সমালোচকদের অভিমত।
আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ে এসব সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুলিশের আবেদনের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত দেন। ফলে স্বাধীন বিচারিক ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীর সাম্প্রতিক ঘটনাও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। তিনি পাঁচটি মামলায় জামিন পাওয়ার পরও পুলিশের আবেদনের ভিত্তিতে তাকে নতুন আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই মামলাটিও ভিত্তিহীন ছিল। আদালতে সেই আবেদনের ‘যৌক্তিকতা’ যথাযথভাবে যাচাই হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এটি বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার দিককে সামনে আনে। ম্যাজিস্ট্রেটরা কাগজে-কলমে স্বাধীন হলেও বাস্তবে অনেক সময় নির্বাহী প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেন না।
এখন নজর থাকবে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের মামলায় ম্যাজিস্ট্রেট কী সিদ্ধান্ত দেন। অনেকেই আশা করছেন, আদালত স্বাধীনভাবে এবং আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে কিন্তু বিষয়টি শুধু আশার ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। কারণ, নাগরিকদের ন্যায্য ও স্বাধীন বিচার পাওয়ার অধিকার মৌলিক।
এজন্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকেও ভূমিকা রাখতে হবে বলে মত দিচ্ছেন অনেকে। বিচারকদের আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—এই বার্তা স্পষ্টভাবে না গেলে নির্বাহী প্রভাব কমানো কঠিন হবে। বিচার বিভাগকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ নয়, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক সদিচ্ছাও জরুরি।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই বিচারিক প্রক্রিয়া নির্বাহী প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ থেকে শুরু করে ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়েও অনেক সময় রাজনৈতিক নির্দেশনার প্রভাব পড়ে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রমাণ ছাড়া ‘শোন অ্যারেস্ট’ অনুমোদন চলতে থাকলে ধারণা তৈরি হয় যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে ফৌজদারি প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে বা তা সহ্য করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যুক্ত আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের জন্যও বিষয়টি নতুন নয়। তার কাছ থেকে আইনের শাসন রক্ষায় কঠোর অবস্থান প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সমাজের একটি অংশে এমন মানসিকতাও দেখা যাচ্ছে, যেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে দোষী ধরে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেক তরুণের মধ্যেও এই ধারণা দেখা যায় যে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই অপরাধের সমান। এই প্রবণতা বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এটি শুধু অতীতের স্বৈরশাসনের সময়েই নয়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দেখা যাচ্ছে। ফলে জবাবদিহির দাবি কখনো কখনো সমষ্টিগত শাস্তির রূপ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ আবারও প্রাতিষ্ঠানিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত নয়—এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করাকে অনেকে হয়রানিমূলক ও বেআইনি বলে মনে করছেন। একই সঙ্গে এটি শহীদদের স্মৃতির প্রতিও অসম্মান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ অপরিহার্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মামলা ব্যবহৃত হলে তা বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং ন্যায়বিচারের লক্ষ্যই ব্যাহত হয়।
- লেখক: ডেভিড বার্গম্যান, ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী। সূত্র: ডেইলি স্টার

