জাতীয় দলের ক্রিকেটার মো. নাঈম হাসানকে চট্টগ্রামে পুলিশের অভিযানের নামে আটক, মারধর ও থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ ওঠার পরপরই অভিযানে অংশ নেওয়া এক উপপরিদর্শকসহ তিন পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এদিকে নাঈমের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে মারধর ও অপহরণের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার এলাকায় ঘটনাটি ঘটে। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষে বিমানযোগে চট্টগ্রামে ফেরেন নাঈম হাসান। বিমানবন্দর থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে বাসার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। পথে লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অটোরিকশাটি থামান।
নাঈমের অভিযোগ, গাড়ি থামানোর পর কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে চালকের কাগজপত্র দেখতে চান। একপর্যায়ে তাঁকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে জোরপূর্বক অন্যত্র নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তিনি নিজের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয়পত্রও দেখান। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
জাতীয় দলের এই স্পিনার অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা একজন ব্যক্তি তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। এমনকি আশপাশের মানুষ তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও তাঁকে সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করে হেনস্তা করা হয়। নাঈমের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
ঘটনার আরও গুরুতর দিক হলো, তাঁকে পুলিশের গাড়িতে না তুলে অন্য একটি অটোরিকশায় করে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে তাঁকে খুলশী থানায় নেওয়া হয়। সেখানে থানার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন বলে দাবি করেন।
নাঈম জানান, ঘটনার সময় তাঁর মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। পরে ফোন ফিরে পেয়ে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর বিষয়টি দ্রুত ক্রিকেট অঙ্গন ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে যায়। সংশ্লিষ্টরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে।
ঘটনার পর নাঈম স্পষ্টভাবে বলেন, তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থেও সুষ্ঠু তদন্ত চান। তাঁর মতে, তিনি পরিচিত মুখ হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত আলোচনায় এসেছে। কিন্তু প্রতিদিন অনেক সাধারণ নাগরিক এমন পরিস্থিতির শিকার হলেও তাদের পক্ষে কেউ দাঁড়ানোর সুযোগ পান না।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একটি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ওই এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট অটোরিকশায় চোরাচালান হওয়া স্বর্ণ থাকতে পারে—এমন তথ্য পেয়েই সদস্যরা সেখানে অবস্থান নেন। তবে তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল এবং অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপকমিশনার জানান, ঘটনার প্রাথমিক পর্যালোচনায় কিছু অসঙ্গতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একটি গোয়েন্দা সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে ধারণা করা হয়েছিল, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় স্বর্ণের চালান বহন করা হচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানে যাঁদের দায়িত্ব ছিল, তাঁরা যথাযথ যাচাই-বাছাই ও পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছিলেন কি না, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খবর পেয়ে রাতেই থানায় ছুটে যান নাঈমের বাবা মাহবুবুল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, ছেলের সঙ্গে যোগাযোগের সময়ই জানতে পারেন তাঁকে আটক করে মারধর করা হচ্ছে। থানায় পৌঁছানোর পর তিনিও অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছেন।
রাত গভীর হওয়ার আগেই থানায় ভিড় করেন নাঈমের স্বজন, বন্ধু ও অসংখ্য ক্রিকেটপ্রেমী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন একজন জাতীয় ক্রিকেটারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হলো।
শনিবার সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে এক উপপরিদর্শক, এক কনস্টেবল এবং পুলিশের সঙ্গে থাকা একজন সোর্সকে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মারধর এবং অপহরণের চেষ্টা।
খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অভিযানের বিষয়ে আগে থেকে তাঁকে অবহিত করা হয়নি। থানায় আনার পরই তিনি জানতে পারেন যে আটক ব্যক্তি জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসান। বিষয়টি জানার পর দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং তাঁকে সম্মানের সঙ্গে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তবে নাঈম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত থানা ছাড়তে রাজি হননি।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযানে জড়িত উপপরিদর্শক শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং আরেক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাটি আবারও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পদ্ধতি, পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে অভিযান পরিচালনা জরুরি হলেও সেটি অবশ্যই আইনি বিধি মেনে এবং মানবিক আচরণ নিশ্চিত করে করতে হবে। অন্যথায় এমন ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণই নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনআস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিতে পারে।

